গত সপ্তাহের এই সময়ে রোগী শনাক্তের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা খুলনা বিভাগ ওই অবস্থানেই রয়েছে। তবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ওই সময়ের চেয়ে বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবারের আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের এই বিভাগে ৫৭৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৭৬৫ জন।

এরপর বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৬৬ জন। রংপুরে ৩৯৬ জন, ময়মনসিংহে ১০২, সিলেটে ৮৮ ও বরিশাল বিভাগে ৫০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় অবস্থা খারাপ হয়েছে রংপুর বিভাগেও। সেখানে গত সপ্তাহের এই সময়ে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩০ জন। ময়মনসিং, সিলেট ও বরিশালের অবস্থা একই রকম রয়েছে।

ঢাকায় করোনা রোগী বেড়ে যাওয়া নিয়ে সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইইডিসিআরের পরামর্শক মুশতাক হোসেন বলেছেন, ঈদের পরপর সীমান্ত এলাকায় করোনার যে প্রকোপ শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলায়। ধীরে ধীরে বন্যার মতো এটা ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসাসহ নানা কারণে মানুষের ঢাকামুখী হওয়া এখানে প্রভাব রেখেছে।

মুশতাক হোসেন বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা পাসপোর্ট নিয়ে ভারত থেকে এসেছেন, তাঁদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা সংক্রমিত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সেভাবে হয়নি। এটাও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির একটা বড় কারণ হতে পারে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় তুলে ধরে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, ‘করোনা শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। জনসমাগম যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি হলো করোনার টিকা দেওয়া। কিন্তু টিকা যেহেতু সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না, সে কারণে আমাদের অন্য উপায়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।’

করোনা রোগীদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে এলাকায় এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ। জেলা হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউর ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।

মুশতাক হোসেন বলেন, কারও করোনা ধরা পড়লে তাঁর বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে ভীতির পরিবেশ তৈরি না করে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে। তাহলেই সবাই করোনার পরীক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবেন। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা জেলায়। মহানগর মিলিয়ে এই জেলায় শনাক্ত হয়েছে ৯১৬ জন। এরপর বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে গাজীপুরে ১১৫ জন (গত সপ্তাহের এই সময়ে ছিল ৪৭) ও টাঙ্গাইলে ১১৩ জন (গত সপ্তাহের এই সময়ে ছিল ৪৬)। এ ছাড়া ফরিদপুরে ৫৭ জন, গোপালগঞ্জে ৪৩, কিশোরগঞ্জে ২৩, রাজবাড়ীতে ২০, নারায়ণগঞ্জে ১৭, মাদারীপুরে ৯, মুন্সিগঞ্জে ৬, নরসিংদীতে ৫, মানিকগঞ্জে ৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই বিভাগের শুধু শরীয়তপুর জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।

খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে যশোরে ২০৩ জন, গত সপ্তাহের এই সময়ে সেখানে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০ জন। এরপর রয়েছে খুলনা জেলা, রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৮১ জন (গত সপ্তাহে ১২২)। এরপর সাতক্ষীরায় ৮৮ জন (গত সপ্তাহে ৪৮), কুষ্টিয়ায় ৭৩, চুয়াডাঙ্গায় ৫৯ (গত সপ্তাহে ৩৭), বাগেরহাটে ৫২ (গত সপ্তাহে ৬৩), ঝিনাইদহে ৩১ (গত সপ্তাহে ২১), নড়াইলে ৩৮ (গত সপ্তাহে ৫), মাগুরায় ২১ ও মেহেরপুরে ১৯ জন (গত সপ্তাহে ৯) রোগী শনাক্ত হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী জেলায় ৩৩৪ জন (গত সপ্তাহে ৩৫৩)। এরপর জয়পুরহাটে ৭২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৮, নাটোরে ৬৬, বগুড়ায় ৪২, নওগাঁয় ৩৪, সিরাজগঞ্জে ৩১ ও পাবনায় ১৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই জেলাগুলোর মধ্যে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে রোগী শনাক্ত কিছুটা বাড়লেও সপ্তাহ দুয়েক ধরে খারাপ অবস্থায় থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় ১৬৯ জন, গত সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল ১১৯। এরপর নোয়াখালীতে ১০১ জন (গত সপ্তাহে ৮৭) ও কক্সবাজারে ৬১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে দিনাজপুরে ২৭৫ জন, যেখানে গত সপ্তাহের এই সময়ে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৪৩ জন। এরপর ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৭ জন, নীলফামারীতে ২০ ও কুড়িগ্রামে ১৩ জন শনাক্ত হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে জামালপুর জেলায় ৪২ জন। এরপর ময়মনসিংহ জেলায় ২৬ জন, শেরপুরে ২৮ এবং নেত্রকোনায় ৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে পিরোজপুরে ১৭ জন। এরপর বরিশাল ও ঝালকাঠিতে ১৩ জন করে। অন্য সব জেলার অবস্থা এখনো ভালো আছে। সিলেট বিভাগে বেশি রোগী সিলেট জেলায় ৫৮ জন (গত সপ্তাহে ছিল ৬৯)। এরপর রয়েছে মৌলভীবাজার, ২১ জন। অন্য দুই জেলার অবস্থা এখনো ভালো।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন ৬৩ জন। এ সময় সবচেয়ে বেশি ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে খুলনা বিভাগে। এরপর রাজশাহী বিভাগে মারা গেছেন ১৩ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১১ জন, ঢাকা বিভাগে ১০ জন, বরিশাল বিভাগে ৩ জন এবং সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২ জন করে মারা গেছেন।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম নতুন করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়। পরে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। গত বছরের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ কমতে থাকে।

এ বছরের মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ আবার বেড়ে যায়। মার্চের প্রথমার্ধেই দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হাজারের ওপরে চলে যায়। বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ২৬ মার্চের বুলেটিনে আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়, সেখানে ১৯ এপ্রিলের বুলেটিনে আগের ২৪ ঘণ্টায় ১১২ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ওই দিনই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়।
করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় ৫ এপ্রিল থেকে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যা এখনো বহাল। এ বিধিনিষেধে মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে গত মাসের মাঝামাঝিতে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ‘লকডাউন’ ঢিলেঢালা হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে রোগী দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সব মিলিয়ে কিছুদিন ধরে সারা দেশেও করোনা শনাক্তের সংখ্যা আবার বাড়ছে।