বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ তো গেল বিশ্ব পরিস্থিতি। অঞ্চলে অঞ্চলে, দেশে দেশেও আছ হিসাব-নিকাশ। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বলয় যখন বাংলাদেশকে নির্বিঘ্নে টিকা সরবরাহ করতে পারল না, সে সুযোগটা কাজে লাগায় চীন। বাংলাদেশকে ভারতের টিকা সরবরাহের ব্যর্থতার সুযোগ নিতে শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম দামে বাংলাদেশের কাছে টিকা বিক্রি করেছে চীন। টিকা নিয়ে বাংলাদেশ বিপাকে পড়ার পরপরই দুই দফায় চীন ১১ লাখ টিকা বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। এর আগপর্যন্ত তারা মোটামুটি চুপচাপ ছিল।

এর পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া এককভাবে তাদের উদ্ভাবিত টিকা বিপণনে দর–কষাকষিতেও নেমেছে। তাতে পরিস্থিতি কিছুটা নাজুকও হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ভারতের সেরাম, চীনের সিনোফার্ম, রাশিয়ার স্পুতনিক এবং কোভ্যাক্সের সরবরাহ মিলিয়ে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে ১০ কোটি টিকা সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু দেশের ৮০ ভাগ লোককে দুই ডোজ করে টিকা দিতে হলে ২৬ কোটি টিকার দরকার। তাই বাকি টিকার হিসাব মেলানও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কিছুটা আগেভাগে করোনার টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের উদ্ভাবিত ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিয়ে বাংলাদেশ গত ফেব্রুয়ারিতে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছিল। কিন্তু কাঁচামালের সংকট আর ভারতে করোনা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির পর সেরাম বাংলাদেশে টিকা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। টিকা নিয়ে বিপাকে পড়ে যায় বাংলাদেশ। সেরাম থেকে কেনা আর ভারতের উপহারের টিকা চলতে থাকলেও ১৫ লাখ মানুষের দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

সেরাম থেকে টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত মার্চে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বাংলাদেশ। কাছাকাছি সময়ে দুই দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও চীনের সিনোফার্মের সঙ্গে চুক্তি করে টিকা আনা শুরু হয়েছে। রাশিয়া থেকে টিকা কেনার প্রক্রিয়া এ মাসে চূড়ান্ত পরিণতি পাওয়ার কথা।

চীনের কাছ থেকে ১১ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া ২৫ লাখ টিকা দিয়ে সরকার আবার পুরোদমে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। চীনের সিনোফার্ম থেকে দেড় কোটি টিকার পর বাড়তি টিকা কেনার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাকের কাছ থেকেই টিকা কেনা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়া থেকে এক কোটি টিকা কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। সেই সঙ্গে টিকার বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে কয়েক কোটি টিকা পাওয়ার আশা বাংলাদেশের। সরকার দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশের ২৬ কোটির বেশি টিকার প্রয়োজন।

সংকটের মূলে একক উৎসে নির্ভরতা

বাংলাদেশ যে সেরামের টিকা নিয়েই গণটিকা কর্মসূচি সাজিয়েছে, তা একরকম দৃশ্যমান ছিল। ডব্লিউএইচওর অনুমতি পায়নি এমন টিকা নেওয়া উচিত হবে না—এমন দোহাই দিলেও কূটনীতিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের মতে, একক নির্ভরতার কারণে টিকার সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ, গত বছরের শেষ দিকে রাশিয়া ও চীন তাদের টিকা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাতে উৎসাহ ছিল না সরকারের। বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার প্রস্তাব একেবারে শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য যে পরিমাণ টিকা প্রয়োজন তা সেরাম ছাড়া চীনের পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব। তাই শুরু থেকে বিকল্প হিসেবে চীনকে রাখা হলে টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেরামের টিকা নিয়ে বাংলাদেশ যখন সংকটে আছে, তখন চাহিদা অনুযায়ী কয়েক কোটি টিকা নিয়ে এই মুহূর্তে চীনের পক্ষেই সহায়তা করা সম্ভব।

জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে করোনার টিকা সংগ্রহের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স বাংলাদেশের জন্য এক কোটি ডোজ টিকা বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে আগস্টে পাঠাচ্ছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১০ লাখ ডোজ টিকা। কোভ্যাক্সের মোট টিকার ৬০ ভাগ সরবরাহ করার কথা ছিল ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের। ভারতের করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি আর কাঁচামাল সংগ্রহে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী টিকা উৎপাদনে সেরাম ব্যর্থ হয়েছে। তাই কোভ্যাক্সও পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশকে টিকা দিতে পারছে না। সার্বিক পরিস্থিতিতে কোভ্যাক্সের আওতায় বাকি ৯০ লাখ টিকা আগামী মাস তিনেকের মধ্যে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ঘাটতি পূরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেও অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের এফডিএর (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) অনুমতি না পাওয়ায় মজুতে থাকা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা বাংলাদেশকে দিতে পারেনি। তবে নিজের মজুতে থাকা টিকা থেকে কোভ্যাক্সের আওতায় বাংলাদেশকে মর্ডানার ২৫ লাখ টিকা উপহার দিয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আরও টিকা বাংলাদেশকে দিতে পারে। চীন থেকে কেনা টিকার প্রথম চালান এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপহারের টিকা একই দিনে ঢাকায় এসেছে। বিষয়টা কাকতাল। তবে বাংলাদেশকে টিকা সরবরাহের বিষয়টি বিপরীত অবস্থানে থাকা দুই দেশ যে মাথায় রেখেছে, তাও উল্লেখের দাবি রাখে।

জনস্বাস্থ্যের তুলনায় অগ্রাধিকার ভূরাজনীতিতে

সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, করোনার মতো মহামারিতে টিকা যে একটি কোমল অস্ত্র হয়ে উঠেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। যদিও এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। সারা বিশ্ব টিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ায় চীন দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে টিকা সরবরাহ করে সংকট দূর করতে এগিয়ে এসেছে। পাশাপাশি নিজের প্রভাব বাড়ানোয় মনোযোগ দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন, করোনা সংক্রমণের সময় শুধু টিকা নয়, নানা রকম সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের প্রতিযোগিতাটা দৃশ্যমান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জুনের ৪ ও ৮ তারিখ তাদের বিমানবাহিনীর বিমানে করে বাংলাদেশের জন্য করোনা মোকাবিলার নানা সামগ্রী পাঠিয়েছে। এর পরপরই দেখা গেল, চীনের উপহারের টিকা আনতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যে বিমান বেইজিং গেছে, তাতেই ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি।

টিকা কূটনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, টিকার মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা একাবারেই কাম্য নয়। টিকা বিশ্বের সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। ধনী দেশগুলো তাদের প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ টিকা মজুত করেছে। অথচ বাংলাদেশসহ অনেক দেশ সংকটে আছে। বড় দেশগুলো অন্য দেশকে টিকা দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে—এটাই এ সময়ের প্রত্যাশা।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন সম্প্রতি বেইজিংয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, চীন ৪০টি দেশে টিকা বিক্রিসহ ৮০টি দেশকে ৩৫ কোটির বেশি টিকা দিয়ে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে এক কোটি টিকা দিয়েছে কোভ্যাক্সের।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন দেশে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের এগিয়ে থাকার পেছনে বড় ভূমিকা তাদের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের। চীনের টিকা উৎপাদিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে ফাইজার আর অ্যাস্ট্রাজেনেকা দিয়ে। দামে সস্তা সিনোফার্মের টিকা চীন যতটা পরিকল্পিতভাবে বিতরণ করতে পারছে, সেটা সম্ভব হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে।

চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিভিন্ন দেশকে কোভ্যাক্স ও নিজের মজুতের টিকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। এই পরিকল্পনার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র আগামী বছরের জুনের মধ্যে বিভিন্ন দেশকে ফাইজারের ৫০ কোটি টিকা উপহার দেবে। এর মধ্যে ২০ কোটি টিকা দেওয়া হবে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র জাপানও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। জাপান গত মাসে বিভিন্ন দেশকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১ কোটি ৩০ লাখ টিকা উপহার হিসেবে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

আসিয়ান দেশগুলোতে চীন নিয়ে প্রশ্ন

আপাতদৃষ্টিতে ভূরাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে চীন টিকা নিয়ে এগিয়ে গেলেও সব দেশ যে এতে সমান সন্তুষ্ট, তা বলা যাচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীনের চিকিৎসাসহায়তা নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেশটির বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউট ‘দি স্টেট অব সাউথইস্ট এশিয়া ২০২১ পোল’ জরিপটি পরিচালনা করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন, কোভিডে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে চীন। ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন, চীন এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত রাজনৈতিক শক্তি, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক শক্তির বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর্বে চীন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে মনোযোগ দিচ্ছে। কারণ, দেশটি তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত টিকা বিভিন্ন দেশে উপহার হিসেবে দিচ্ছে। আবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের টিকা বিক্রি ও যৌথ উৎপাদনের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। এখন বাংলাদেশের সামনে চীনের সঙ্গে টিকার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেটাকে কাজে লাগাতে মনোযোগ দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

পথ দেখাচ্ছে ইতিহাস

মহামারি মোকাবিলায় ছয় দশক আগে পোলিওর টিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা বিশ্ববাসীকে উজ্জীবিত করে। তখনকার দুই বৈরী দেশ প্রমাণ করেছিল প্রাণঘাতী রোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার পথে রাজনৈতিক বৈরিতা কাঁটা হতে পারে না। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে ছায়াযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সময় দুই দেশ মানবেতিহাসের বড় টিকা পরীক্ষাগুলোর একটিতে একে অন্যকে সহায়তা করেছিল। তাই টিকা কূটনীতির দীর্ঘ ইতিহাস এই শিক্ষাই দেয়, ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফল হতে পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। কোভ্যাক্স প্রতিষ্ঠা এমনই সমন্বিত পদক্ষেপের নীতিগত প্রতিফলন।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন