বিশ্লেষণ
হঠাৎ ১০ শতাংশ মানুষ টিকা থেকে বাদ
১২ বছরের বেশি সব মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ্যমাত্রার পরিবর্তনে টিকা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দেবে।
করোনা টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়েছে টিকাদানের নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করার কারণে। টিকাদান শুরুর প্রায় এক বছর পর এসে বলা হচ্ছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া হবে। আগে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ শতাংশ। হঠাৎ ১০ শতাংশ মানুষকে কেন করোনার টিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে ও কাদের বাদ দেওয়া হবে, তা স্বাস্থ্য বিভাগ পরিষ্কার করেনি।
জাতীয় করোনা টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। এক বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সে কথাই বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু গত শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে বলে জানান।
নতুন এই লক্ষ্যমাত্রা এমন সময় ঘোষণা করা হলো, যখন দেশের মানুষকে তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে, ১২ বছর বা তার বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং ষাটোর্ধ্ব প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখনো এক ডোজও টিকা পাননি। দেশের জনসংখ্যার ৮০ ও ৭০ শতাংশের পার্থক্য প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। হঠাৎ এসব মানুষ কীভাবে বাদ পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে বলেছে।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ৭০ শতাংশকে দ্রুততম সময়ে টিকার আওতায় আনতে হবে। সেটা করা সম্ভব হলে রোগের তীব্র উপসর্গ থেকে জনসাধারণকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে। হাসপাতালে কম রোগী ভর্তির প্রয়োজন হবে।
সংবাদ সম্মেলনের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা কমিটির সদস্যসচিব মো. শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেছেন, অতিসম্প্রতি জাতীয় করোনা টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনা পরিমার্জন করা হয়েছে। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
কারা বাদ পড়বে?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দিচ্ছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই একই বয়সী সব শিশু-কিশোর-কিশোরীকে টিকার আওতায় আনা হবে। এর অর্থ ১২ বছর ও তদূর্ধ্ব সব মানুষ টিকা পাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার। এর মধ্যে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ ১৩ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার। এদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তথা বুস্টার ডোজ দেওয়া চলছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জনসংখ্যার ৭০ শতাংশকে টিকা দিলে মোট ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার মানুষ টিকা পাবে। তা হলে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ কোটি ৩৯ লাখ ২৪ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এদের কেন বাদ দেওয়া হবে, কীভাবে বাদ দেওয়া হবে, শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে তা স্পষ্ট করেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
টিকা পাওয়া ও দেওয়া
কত মানুষকে টিকা দেওয়া হবে বা যাবে, তার পুরোটাই নির্ভর করে কত টিকা পাওয়া গেল তার ওপর। উপহার, কেনা ও অনুদান—এই তিন উপায়ে বাংলাদেশ মোট ২৪ কোটি ১৪ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে।
২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ মিলে মোট ১৫ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে ৯ কোটি ডোজের বেশি টিকা আছে। শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বলেছেন, ৯ কোটি টিকা এখনো আছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা অভিযোগ করে আসছেন, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা না করে, বিজ্ঞানীদের পরামর্শ না নিয়ে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর হুটহাট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে। আলোচনা করলে, পরামর্শ শুনলে স্বাস্থ্য বিভাগের নেওয়া পদক্ষেপগুলো হয়তো আরও সুন্দর হতে পারত। যেমন: দেশের কয়েক কোটি মানুষ এখনো কোনো টিকাই পায়নি, সেখানে সরকার হঠাৎ বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু করেছে। রোগনিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্যতা—দুই দিক থেকেই বিষয়টি ঠিক হয়নি।
করোনার নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার সময়ে মানুষের মধ্যে বুস্টার ডোজের ব্যাপারে আগ্রহ দেখা গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বুস্টার ডোজের বিষয়টি প্রচারে আনার চেষ্টা করছে। শুরুতে বুস্টার ডোজের বয়সসীমা ৬০ বছর রাখা হলেও এখন তা কমিয়ে ৫০ বছর করা হয়েছে। এই বয়সসীমা আরও কমানো হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অথচ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখনো এক ডোজও টিকা পায়নি।
অন্যদিকে দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার ঠিক কত দিন পর বুস্টার ডোজ নিলে সুরক্ষা বেশি পাওয়া যাবে, তা এখনো স্পষ্ট করে বলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুধু বলেছে, দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ছয় মাস পর বুস্টার ডোজ পাওয়া যাবে। কেউ নিচ্ছে ৬ মাস পর, কেউ নিচ্ছে ১০ মাস পর। দেশের একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, তিনি চতুর্থ ডোজ নিয়েছেন। এমন উদাহরণ আরও আছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ৮০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পেরে স্বাস্থ্য বিভাগ নতুন লক্ষ্যমাত্রার কথা বলছে। বয়সসীমা হঠাৎ ৫৫ থেকে ৪০ বছর করা হয়েছিল। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না। অথচ ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ঝুঁকি রয়েই গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ খেয়ালখুশিমতো গোলপোস্ট বসাচ্ছে।