দেশে চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (ট্রায়াল) নিশ্চিত হয়েছে। সরকার করোনা প্রতিরোধে চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের টিকা পাওয়ার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের চীনা টিকা পরীক্ষার সরকারি অনুমোদনের কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ সময় তিনি বলেন, চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানি আইসিডিডিআরবির মাধ্যমে টিকা পরীক্ষার জন্য যে আবেদন করেছিল, তার কার্যকারিতা নিয়ে নানাবিধ বিশ্লেষণ শেষে সরকার অনুমোদন দিয়েছে। যত দ্রুত টিকার পরীক্ষা শেষ হবে, তত দ্রুত দেশের মানুষ টিকা পাবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রগুলো বলছে, সরকার একাধিক উৎস থেকে করোনা টিকা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। করোনা টিকাবিষয়ক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে বিনা মূল্যে টিকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সরকার ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে। স্বল্পমূল্যে এবং প্রয়োজনে পূর্ণ মূল্য দিয়ে টিকা কেনার বিকল্প পথও সরকার খতিয়ে দেখছে। টিকা কেনার জন্য ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরির কাজও চলছে। এই পরিস্থিতিতে চীনা টিকার পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের টিকা পাওয়ার সুযোগ কিছুটা বাড়াল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, টিকা পরীক্ষার অনুমোদন দিয়ে সরকার সুবিবেচকের পরিচয় দিয়েছে। পরীক্ষা সফল হলে এই টিকা দেশি কোম্পানি তৈরি করতে পারবে।
কাটল অনিশ্চয়তা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা প্রতিরোধে প্রায় ২০০ টিকার বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী, বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। ১২ আগস্ট রাশিয়া টিকা তৈরি করে মানুষের শরীরে প্রয়োগ করছে—এমন ঘোষণাও দিয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি টিকা মানুষের শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। তৃতীয় পর্যায়ের এসব পরীক্ষায় টিকা কতটুকু নিরাপদ ও কতটা কার্যকর, তা দেখা হবে।
চীনা টিকার নিরাপদ ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা বা পরীক্ষা করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)।
বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) গত মাসে আইসিডিডিআরবিকে টিকা পরীক্ষার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল। তারপরই সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, মহামারির জরুরি পরিস্থিতিতে নীতিগত অনুমোদন যথেষ্ট নয়। আরও বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকার টিকার পরীক্ষার চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে চায়।
এরপর চীনা টিকার পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বাংলাদেশে এসে ভারতে তৈরি টিকা দিয়ে সহায়তা করার কথা বলে যান। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, চীনা টিকার পরীক্ষা বুঝি বন্ধ হয়ে গেল। গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে।
চীনের সিনোভ্যাকের টিকার পরীক্ষা চলছে ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ায়। তুরস্ক, সৌদি আরব ও চিলিতে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সামাজিক সংক্রমণ চলছে এমন পরিস্থিতি বজায় থাকা দরকার হয়। করোনা সংক্রমণ চীনে শুরু হলেও দেশটিতে এখন সামাজিক সংক্রমণ নেই। করোনার সামাজিক সংক্রমণ বজায় আছে বাংলাদেশসহ ওই পাঁচটি দেশে।
বিএমআরসিতে জমা দেওয়া গবেষণা দলিলে আইসিডিডিআরবি বলেছিল, ৪ হাজার ২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করবে তারা। এর মধ্যে ২ হাজার ১০০ জনের শরীরে টিকা দেওয়া হবে। বাকি ২ হাজার ১০০ জনের শরীরে টিকাসদৃশ জিনিস দেওয়া হবে। কে টিকা পাবেন আর কে টিকাসদৃশ জিনিস পাবেন, তা জানবেন শুধু গবেষকেরা।
বিএমআরসিতে জমা দেওয়া গবেষণা দলিলে আইসিডিডিআরবি বলেছিল, ৪ হাজার ২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করবে তারা। এর মধ্যে ২ হাজার ১০০ জনের শরীরে টিকা দেওয়া হবে। বাকি ২ হাজার ১০০ জনের শরীরে টিকাসদৃশ জিনিস দেওয়া হবে। কে টিকা পাবেন আর কে টিকাসদৃশ জিনিস পাবেন, তা জানবেন শুধু গবেষকেরা। এরপর টিকা পাওয়া ও টিকা না পাওয়া দুই দলের মধ্যে ফলাফল পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তার প্রতিকার করার ব্যবস্থার কথা গবেষণা প্রকল্পে বলা আছে। তবে এদের কেউ কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা পাবেন না।
টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মুখ্য গবেষক ও আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. কে জামান প্রথম আলোকে বলেন, পরীক্ষার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন দরকার। সেই অনুমোদন পেলে চীন থেকে টিকা আমদানি করা হবে।
পরীক্ষার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন দরকার। সেই অনুমোদন পেলে চীন থেকে টিকা আমদানি করা হবে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
পরীক্ষা শুরুর জন্য আরও কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন ড. কে জামান। এর মধ্যে আছে: মাঠপর্যায়ে গবেষক নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ, সাতটি হাসপাতালের অনুমতি, ৪ হাজার ২০০ অংশগ্রহণকারীর জন্য স্মার্টফোন সংগ্রহ। তিনি বলেন, ‘এসব কাজ শেষ করে দ্রুত আমরা পরীক্ষা শুরু করব।’
গতকাল বিকেলে যোগাযোগ করলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালেহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইসিডিডিআরবির গবেষণা প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য ১০ জন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশের মতামত পাওয়া গেছে। সবার মতামত আজ (বৃহস্পতিবার) চলে আসার কথা। সেগুলো এলে আজই অনুমোদন দেওয়া হবে।’
আইসিডিডিআরবির গবেষণা প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য ১০ জন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশের মতামত পাওয়া গেছে। সবার মতামত আজ (বৃহস্পতিবার) চলে আসার কথা। সেগুলো এলে আজই অনুমোদন দেওয়া হবে।মো. সালেহউদ্দিন,পরিচালক , ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট-১, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইউনিট-২ এবং ঢাকা মহানগর হাসপাতাল—এই সাতটি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী পরীক্ষায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, দেশে এই পরীক্ষা হলে বাংলাদেশ ১ লাখ টিকা ও টিকাসামগ্রী বিনা মূল্যে পাবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকা কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে বলে সরকার মনে করছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের আটটি কোম্পানি টিকার পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে পরীক্ষার আগ্রহ দেখালে সরকার তা বিবেচনা করবে।
এদিকে করোনাবিষয়ক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ১৮তম সভায় টিকার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সংবাদপত্রে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টিকার ব্যাপারে পদক্ষেপ জোরদার করছে। করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই দুই প্রকল্পে করোনার টিকার জন্য অর্থ বরাদ্দ আছে। বাজারে টিকা আসা মাত্রই ওই অর্থ ব্যয় করার কথা বলেছে পরামর্শক কমিটি।