কাজে যোগ দিতে সৌদি আরবের ভিসা নিয়েছেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ এমদাদুল হক। অনলাইনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিবন্ধনও নিয়েছেন। কিন্তু টিকা নিবন্ধনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সুরক্ষায় চট্টগ্রামের কোনো হাসপাতালের নাম পাচ্ছেন না। শুধু ঢাকার সাতটি হাসপাতালের নাম দেখানো হচ্ছে। তাই তিনি টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারেননি।
এমদাদুল হকের অভিযোগের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথমে সৌদি ও কুয়েতগামী প্রবাসীদের জন্য শুধু ফাইজারের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ জন্য সুরক্ষায় ঢাকার সাতটি হাসপাতালের নাম রাখা হয়। গত মঙ্গলবার থেকে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় মডার্নার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রবাসীদের জন্য ঢাকার বাইরের হাসপাতালে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়নি সুরক্ষায়। টিকার জন্য গতকাল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিক্ষোভও করেছেন প্রবাসীরা।
প্রবাসী কর্মী ও অভিবাসন খাতের বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসীদের টিকা প্রদান নিয়ে শুরু থেকেই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। বিএমইটির নিবন্ধন নিশ্চিতে বাড়তি সময় নেওয়া, সুরক্ষায় নিবন্ধন করার এক সপ্তাহের মধ্যে এসএমএস (মুঠোফোনে খুদে বার্তা) না পাওয়ার অভিযোগ তাঁদের।
প্রবাসীদের তালিকা তৈরি করছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান বিএমইটি। আর টিকা প্রদান করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। টিকা নিবন্ধনের প্ল্যাটফর্ম সুরক্ষার কারিগরি দিকটি দেখছে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান।
মডার্নার টিকার নিবন্ধনের সুযোগ ঢাকার বাইরের হাসপাতালে না থাকার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন প্রথম আলোকে বলেন, মডার্নার টিকাও দেওয়া শুরু হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যেই ঢাকার বাইরের টিকাকেন্দ্রে নিবন্ধন করতে পারবেন প্রবাসীরা।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, টিকার জন্য প্রবাসীদের নিবন্ধন শুরু হয় ৫ জুলাই। এর আগে দেড় লাখ বিদেশগামী কর্মীর একটি তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ টিকা নেওয়ার আগেই বিদেশে চলে গেছে। আর ১ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত নতুন করে প্রায় এক লাখ কর্মী বিএমইটিতে নিবন্ধন করেছেন। প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মী নিবন্ধন করছেন। কিন্তু টিকার বিষয়টি পুরোপুরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন প্রথম আলোকে বলেন, দ্রুততার সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে।
টিকা পেতে প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে অভিবাসন খাতের নাগরিক সমাজের ফোরাম বিসিএসএম। ওই অনুষ্ঠানে প্রবাসী কর্মীরা অভিযোগ করেন, বিএমইটির অনলাইন অ্যাপ আমি প্রবাসীতে আবেদনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধন নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু এর চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
বিএমইটি বলছে, আমি প্রবাসী অ্যাপে দিনে এক হাজার নিবন্ধনের সক্ষমতা ছিল আগে। এসব আবেদন পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে যাচাই করা হয়। টিকার জন্য হাজার হাজার কর্মীর আবেদনের কারণে হঠাৎ চাপ বেড়ে যায়। এখন সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৫ হাজার করা হয়েছে। তাই এখন ৭২ ঘণ্টা নয়, দিনের মধ্যেই নিবন্ধন হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বিএমইটির মহাপরিচালক মো. শহীদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। যেখানে সমস্যা আসছে, সেখানেই সমাধান করা হচ্ছে।
তবে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই ডোজ টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন প্রবাসীরা। টিকার নিবন্ধন করেও অনেকে তারিখ পাচ্ছেন না। সৌদিগামী ফরিদপুরের মাহবুব হোসেন ৬ দিন আগে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে টিকা দিতে নিবন্ধন করেছেন। গতকাল পর্যন্ত এসএমএস পাননি। টাঙ্গাইলের আবুল কালাম কুর্মিটোলা হাসপাতালে টিকা দিতে নিবন্ধন করেছেন ৪ জুলাই। ১০ দিনেও তিনি টিকা দিতে এসএমএস পাননি।
অভিবাসন খাতের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বছরে দুই লাখ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অথচ তাঁদের জন্য সরকারের বিনিয়োগ নেই। টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রবাসীরা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এটি দূর করতে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।