রোগীর চাপ নেই, তাই কমছে হাসপাতাল

করোনাভাইরাসের প্রতীকী ছবি

দেড় মাসের বেশি সময় ধরে দেশে করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি শয্যা ফাঁকা থাকছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সংখ্যা কমানো শুরু করেছে সরকার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসে (কোভিড–১৯) আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেসব হাসপাতাল কমানো হবে সেগুলোর তালিকা তৈরির কাজ চলছে। শুরুতে রাজধানী ঢাকার হাসপাতাল কমানো হচ্ছে। এ ছাড়া কোভিড ও নন-কোভিড দুই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, এমন হাসপাতালগুলোর কোভিড ইউনিট বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটে রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর করোনার জন্য নির্ধারিত রাজধানীর রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালে ১০ জুলাই থেকে রোগী ভর্তি বন্ধ রয়েছে।

করোনা রোগীদের জন্য দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ১৫ হাজার ২৫৫টি। এসব শয্যায় গতকাল রোববার রোগী ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৮৫ জন। একইভাবে ৫৪৩টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রোগী ছিলেন ৩২৪ জন। মোট শয্যার ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আইসিইউর ৪০ দশমিক ৩ শতাংশই ফাঁকা ছিল।

অন্যদিকে দেশে গতকাল পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫৪৯। করোনায় এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ হাজার ৬৫৭ জন। সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫০ জন। এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন (সুস্থ ও মৃত বাদে) ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৪২ জন। অর্থাৎ, মোট রোগীর মাত্র ৪ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ২ হাজার ১৩ শয্যার অস্থায়ী হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৭ মে। মৃদু ও মাঝারি উপসর্গে থাকা করোনা রোগীদের জন্য এই হাসপাতাল তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দেশের সবচেয়ে বড় এই করোনা হাসপাতালে রোগী নেই বললেই চলে। এ হাসপাতালটিতে গতকাল ভর্তি রোগী ছিল মাত্র ১৫ জন। অর্থাৎ, হাসপাতালটির প্রায় সাড়ে ৯৯ শতাংশ শয্যাই ফাঁকা থাকছে। হাসপাতালটি চালুর পর অধিকাংশ সময় রোগী ছিল ৩০-এর আশপাশে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

  • করোনায় আক্রান্ত মোট রোগীর মাত্র চার শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি আছেন

  • নির্ধারিত ১৫ হাজার ২৫৫টি শয্যায় গতকাল রোগী ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৮৫ জন

  • ৫৪৩টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে গতকাল করোনা রোগী ছিল ৩২৪ জন

চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে প্রস্তুতি হিসেবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্ধারণ করে সরকার। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালকে কোভিড বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘোষণা করে সরকার। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালকেও অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অবহেলায় পড়ে থাকা মতিঝিলের রেলওয়ে হাসপাতালটি করোনার জন্য নির্ধারণ করার পর প্রায় দেড় মাস ধরে এটির সংস্কার করা হয়। গত ১ মে ৩০ শয্যার রেলওয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা শুরু হয়। আইসিইউর সুবিধা না থাকায় জটিল রোগী এখানে রাখা হতো না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই থেকেই এই হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি নেই।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে করোনার জন্য শয্যা রয়েছে ৭৮২টি। এর মধ্যে গতকাল রোগী ভর্তি ছিল ২৫০ জন, ৫৩২টি শয্যাই খালি ছিল। করোনার জন্য নির্ধারিত ১০০ শয্যার চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালে গতকাল কোনো রোগীই ভর্তি ছিল না।

রেলওয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দ ফিরোজ আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, করোনা রোগী ভর্তি বন্ধের পর এখন নন–কোভিড রোগীদের জন্য হাসপাতালের বর্হিবিভাগের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

গত ২৬ জুন প্রথমবারের মতো কোভিড হাসপাতালের চার ভাগের তিন ভাগ শয্যা ফাঁকা বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা। সেদিন দেশে করোনার সাধারণ শয্যার ৭০ শতাংশ ফাঁকা ছিল। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত অধিকাংশ দিন ৭০ থেকে ৭৩ শতাংশ শয্যা ফাঁকা ছিল।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে করোনার জন্য শয্যা রয়েছে ৭৮২টি। এর মধ্যে গতকাল রোগী ভর্তি ছিল ২৫০ জন, ৫৩২টি শয্যাই খালি ছিল। করোনার জন্য নির্ধারিত ১০০ শয্যার চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালে গতকাল কোনো রোগীই ভর্তি ছিল না। ১০০ শয্যার হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে রোগী ছিল মাত্র ৬ জন।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আক্রান্তদের একটি বড় অংশের লক্ষণ ও উপসর্গ থাকে মৃদু। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। মূলত যাঁদের অবস্থা গুরুতর, তাঁদেরই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের একটা অংশের মৃত্যু হচ্ছে বাসায়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অবস্থা গুরুতর হওয়ার পরও অনেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না। তাঁরা মনে করছেন, বাসায় যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা হয় হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না। আর না হয় হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাবে না, এমনটা ভেবে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে কেউ কেউ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য গোপন করে বাসায় থাকছেন।

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কোভিড বিশেষায়িত হাসপাতালের মধ্যে কয়েকটিকে সাধারণ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। যেসব হাসপাতালে কোভিড ও সাধারণ—এই দুই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেখানে অন্য রোগীরা আসতে চান না। তাই যেসব হাসপাতালে কোভিড ইউনিট আছে সেখান থেকেও কিছু ইউনিট তুলে দেওয়া হবে। চলতি মাসের শেষ দিকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।

করোনাবিষয়ক সরকারের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য লোকজন পারতপক্ষে হাসপাতালে যেতে চাইছেন না। করোনা রোগী না থাকলে শয্যাগুলো ফেলে রাখার মানে নেই। কোভিড চিকিৎসা তুলে দিলে নন-কোভিড রোগীরা সুবিধা পাবেন। আবার করোনা রোগীর চাপ বাড়লে এই হাসপাতালগুলোতেই চিকিৎসা শুরু করতে সমস্যা হবে না।