ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। কিন্তু দেশে গত ১১ দিনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে ৫২ শতাংশের করোনার বাইরে অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস ছিল না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বিশ্বের অন্য কয়েকটি দেশের তুলনায় নতুন এই ভাইরাসের সংক্রমণে বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ নেই, এমন মানুষের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের নিচে। চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এটি অনেক বেশি। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনেকে হয়তো জানতেন না যে তাঁর কোমরবিডিটি (দীর্ঘমেয়াদি অন্য রোগ) ছিল। উপসংহারে পৌঁছাতে আরও বেশি তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা প্রয়োজন।
গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন করোনায় যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের কতজনের করোনার পাশাপাশি অন্য রোগ ছিল, তার হিসাব দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ১১ দিনে করোনায় মোট ২৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮ জন কোভিড-১৯-এর পাশাপাশি অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগেও আক্রান্ত ছিলেন। শতকরা হিসাবে এই সময়ে মৃত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৮ শতাংশ করোনার পাশাপাশি অন্যান্য রোগেও আক্রান্ত ছিলেন। অন্যান্য রোগের মধ্যে ছিল—ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, কিডনির রোগ, হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ফুসফুসের রোগ, হাইপোথাইরয়েড, অ্যাজমা। তাঁদের অনেকে একসঙ্গে একাধিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বাকি ৫২ শতাংশের কোভিডের বাইরে অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ছিল না।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক তাহমিনা শিরীন প্রথম আলোকে বলেন, বয়স্ক ও কোমরবিডিটি আছে, এমন মানুষের ক্ষেত্রে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি বেশি। তবে বাংলাদেশে বয়স্করা যেমন মারা যাচ্ছেন, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের ক্ষেত্রেও মৃত্যু কম নয়। তিনি বলেন, অনেকে হয়তো জানেন না যে তাঁর অন্য রোগ আছে। যে কারণে কোমরবিডিটি ছিল, এমন রোগীর সংখ্যা কম হতে পারে। তিনি বলেন, শুধু যে কোমরবিডিটি থাকলেই মৃত্যু হবে, এমন নয়। আবার অনেকে হয়তো বুঝতেও পারেন না যে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, এর মধ্যে ফুসফুস অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। এটাও মৃত্যু ত্বরান্বিত করতে পারে। তিনি বলেন, মৃত্যুর পরিপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা গেলে মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোমরবিডিটির সম্পর্কের তাৎপর্য বোঝা যাবে। তাঁরা এটা নিয়ে কাজ করছেন।
গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশে মোট ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৯ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন ৭ হাজার ৬২৬ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৮৩৫ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ সময় মারা গেছেন ২৭ জন। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় গতকাল পর্যন্ত দেশে করোনায় মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অন্যান্য দেশের চিত্র
ভারতের দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ৩১ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ২ হাজার ৯০০ মৃত্যু নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে তাঁরা মারা যান। তাঁদের প্রায় ২০ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস ছিল না। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ কোভিডের পাশাপাশি অন্যান্য রোগেও আক্রান্ত ছিলেন।
আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়াতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ শতাংশের করোনার বাইরে অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস পাওয়া যায়নি। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস গত ২৮ অক্টোবর তাদের দেশের ৬৮২ জনের মৃত্যুর কারণসহ তথ্য প্রকাশ করে। তাতে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশের আগে থেকে অন্য রোগ ছিল।
বাংলাদেশে করোনায় যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশের অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস না থাকার বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, কেউই আসলে ঝুঁকিমুক্ত নন। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে, সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তিনি মনে করেন, কোমরবিডিটি ছিল, এমন রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ, অনেকের বিভিন্ন রোগ থাকে কিন্তু তাঁরা সেটা জানেন না। যেমন অনেকে হয়তো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিন্তু কখনো পরীক্ষা করেননি, যে কারণে তাঁর ধারণা নেই।
গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। পরে সেটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। চীনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের একটি যৌথ মিশন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ষাটোর্ধ্ব এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত লোকজনের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। শুধু করোনায় আক্রান্ত, এমন লোকজনের ক্ষেত্রে চীনে মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে করোনার পাশাপাশি অন্য রোগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি।
৪৫ শতাংশের বয়স ৬০-এর নিচে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনায় যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের বেশির ভাগ ষাটোর্ধ্ব। বাংলাদেশেও এই বয়সী মানুষের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মানুষ বেশি মারা যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এখন পর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশের বয়স ছিল ষাটোর্ধ্ব। বাকি ৪৫ শতাংশের বয়স ৬০-এর কম। চীনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশের বয়স ৬০-এর নিচে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির (সেন্টার ফর ডিজিজি কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছরের বেশি। অর্থাৎ ২০ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের কম।
অবশ্য বাংলাদেশে করোনায় যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের মৃত্যু বাড়ছে। গত জুলাই পর্যন্ত মোট মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৪৪ শতাংশের বয়স ছিল ষাটোর্ধ্ব। এখন এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বয়স্ক ও কোমরবিডিটি আছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি বেশি। কিন্তু কোনো বয়সের মানুষই নিরাপদ নন। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কারোরই উদাসীন হওয়ার সুযোগ নেই।