সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেন। কাজ শেষ করে আজিমপুরের বাসায় ফেরার জন্য তিনি রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে ধানমন্ডি থেকে বাসে উঠেছিলেন। বাসে যখন ওঠেন তখন অনেক যাত্রী ছিল। তিনি বাসের মাঝামাঝি একটি সিটে বসেছিলেন। সারা দিনের ধকল ও যানজটের জন্য বাসে চড়ে বাইরের আওয়াজ থেকে রেহাই পেতে তিনি কানে হেডফোন লাগিয়ে বেশ জোরে গান শোনেন। ঘটনার রাতেও তাই করছিলেন। আর খানিকটা ঝিমুনির মতোও চলে এসেছিল। তাই বাসের ভেতরে কী হচ্ছে, তা তিনি খেয়াল করেননি। বাসের সহকারী একবার ভাড়া নিতে এলে তিনি ভাড়া দিয়েছিলেন।

শিক্ষার্থী বলেন, ‘হুট করেই বুঝতে পারলাম আমার হাঁটুর ওপরে কারও হাতের স্পর্শ। সঙ্গে সঙ্গে তাকিয়ে দেখলাম, পুরো বাস খালি, আর আমার পাশে একজন বসা। বাসের সব লাইট বন্ধ। তাকানোর পর সেই লোক (হেলপার) আর একটু ওপরে হাত দেয়। জোরে ধাক্কা দিয়ে সেই লোককে সিট থেকে নিচে ফেলে দিই। দাঁড়াতে দাঁড়াতে মুঠোফোনটাকে ব্যাগে ঢোকাই। চিৎকার করতে থাকি বাস থামানোর জন্য। কিন্তু চালক বা হেলপার কোনো কথা বলছে না। আমি সামনের দিকে আগাতে গেলে হেলপার দুই হাত দিয়ে আমার মুখ ও হাত চেপে ধরে। পা ও কনুই দিয়ে হেলপারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে থাকি। পা দিয়ে হেলপারের পায়ে জোরে আঘাত করি। হুট করে মনে হলো হেলপার যে হাত ধরে ছিল তা একটু আলগা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাসের জানালাগুলো কোন ফাঁকে বন্ধ করে দিয়েছে, খেয়াল করিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, দরজাতেও বোধ হয় সিটকিনি লাগানো। মনে মনেই চিন্তা করছি বাসের সিটকিনি যে কোথায় থাকে, তা–ও তো জানি না। তবে সামনের দিকে আসতে আসতে সড়কের গতিরোধকের জন্য বাসের গতিও খানিকটা কমাতে বাধ্য হয়েছিল চালক। যখন দেখলাম বাসের দরজায় সিটকিনি লাগানো নেই, কোনো কিছু চিন্তা না করে দরজা খুলে লাফ দিই। বাসে চড়ে অভ্যস্ত বলে তখন আর বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। নেমেই দৌড় দিলাম।’

ওই শিক্ষার্থী জানান, বাস থেকে লাফ দিয়ে যে এলাকায় নেমেছিলেন, সে এলাকা দিনের বেলায়ও বেশ ফাঁকা থাকে। আর রাত নয়টা বেজে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকাই ছিল ফাঁকা। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে শুধু ভাবছি, আমার চিৎকার কেউ শুনতেও পেত না। আর তখন বাস থেকে কীভাবে লাফ দিয়েছিলাম, তা চিন্তা করলেও ভয় লাগছে।’

এ ঘটনায় বিকাশ পরিবহনের ওই বাসচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কুদরত-ই-খুদা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে মাহবুবুর রহমান নামের ওই চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর সহকারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় লালবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে।

ঘটনাটির পর বিকাশ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব হোসেন বলেছিলেন, ওই বাসচালক ও তাঁর সহকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। বাসে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারেও নারী সদস্য আছেন। তাঁরাও বাসে চলাচল করেন। তাই বাসে এ ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনা যাতে একটিও না ঘটে, সে চেষ্টা থাকে সব সময়। তবে গণপরিবহনের চালক ও সহকারীদের প্রায় বেশির ভাগই বলতে গেলে অশিক্ষিত। ছোট থেকে টেম্পোর হেলপারগিরি করে এখন বাস চালায় বা হেলপার হিসেবে কাজ করছে। এদের নৈতিক শিক্ষার অভাব আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা বেকারদের মধ্য থেকে চালক ও সহকারী নিয়োগের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।’

আজকে বাসচালক ধরা পড়ার পর সোহরাব হোসেন বলেন, তাঁরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণসহ অনুসন্ধান চালিয়ে চালককে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ যেভাবে ব্যবস্থা নেবে, তাঁরা তাতে সহযোগিতা করবেন।

এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বাসে চলাচলকারী নারীদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেন শ্রমিকেরা। এর আগেও ঢাকায় কয়েকটি ঘটনায় পরিবহনের মালিকেরা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পুলিশে দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে জোরালো আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, করোনার প্রকোপ কমে আবার যখন পুরোদমে গণপরিবহনগুলো চলাচল শুরু করেছে, তখন থেকেই দেখা যাচ্ছে চালক এবং চালকের সহকারীদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বেপরোয়া গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া, যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ কিছুই বাদ যাচ্ছে না। আর এ ধরনের পরিবেশে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী যাত্রীরা। তাঁরা লোকলজ্জার ভয়ে বেশির ভাগ সময় ঘটনাগুলো চেপে যাচ্ছেন বলে ঘটনার ভয়াবহতা অনেক সময় টের পাওয়া যায় না। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, এই নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, সে ধরনের আরও ঘটনা ঘটেই চলছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বড় কোনো ঘটনায় গণমাধ্যম সরব হলে তখন তড়িঘড়ি করে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে সৈয়দ আবুল মকসুদকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির পক্ষ থেকে গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা লাগানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে পরে আর এ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন