গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আইনের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিলের দাবি

রোববার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সম্পাদক পরিষদের নেতারাছবি : পিএমও

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। বৈঠকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।

এ ছাড়া প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা, সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো, অপতথ্য রোধে ফ্যাক্ট চেকের ব্যবস্থা, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আগে আরও বেশি আলোচনা করা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হয়রানিমূলক মামলা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

আজ রোববার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে সম্পাদক পরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।

বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গণমাধ্যমবিষয়ক আইনগুলো অনেক পুরোনো এবং তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এগুলো বহির্বিশ্বে দেশের গণমাধ্যমের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণাপত্রের ফর্ম ‘বি’তে প্রকাশকদের ঘোষণা ও স্বাক্ষর দিয়ে বলতে হয়, ‘আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পরিপন্থী বা কোনো আপত্তিকর বিষয় আমার উক্ত পত্রিকায় প্রকাশে বিরত থাকিব এবং ১৯৭৩ সনের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের সমুদয় নিয়মাবলি মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।’ এ ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে অগণতান্ত্রিক চরিত্র রয়েছে। সম্পাদক পরিষদ ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সম্পাদকদের পক্ষ থেকে প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ কাজ করছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়।

অপতথ্য রোধের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে মূলধারার সংবাদপত্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। এ জন্য সংবাদপত্রগুলোর ‘ফ্যাক্ট চেকের’ ব্যবস্থা রাখা উচিত। কোনো কোনো সংবাদপত্র ইতিমধ্যে তা শুরু করেছে।

এ ছাড়া গণমাধ্যম কমিশন নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করার আগে একটি রূপরেখা করা প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

সম্পাদক পরিষদ জানিয়েছে, গণমাধ্যম কমিশন করা ও প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার বিষয় পরিষদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীকে আগামী জুন মাসের মধ্যে এ–সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে জুলাইয়ের মধ্যেই সরকার যেন একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে, সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জোর দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক পরিষদ আগামী জুলাই মাসের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘কোড অব কনডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন ও গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়।

মামলা থাকা ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে একটি লিস্ট (তালিকা) দিয়েছি। সেখানে বলেছি, ২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলার আসামি। সেই লিস্টটি একেবারে সম্পূর্ণ তা বলব না, অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। কিন্তু আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে দিয়েছি, প্রধানমন্ত্রী সেটা গ্রহণ করেছেন এবং তথ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, এ ব্যাপারে ওনারা গুরুত্ব দেবেন।’ তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, এত ধরনের মামলা—এটা গণতান্ত্রিক দেশের পরিবেশের জন্য ভালো নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। (বাঁ থেকে) দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, রুশো মাহমুদ, মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, এম এম বাহাউদ্দীন, নূরুল কবীর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, মতিউর রহমান চৌধুরী, শামসুল হক জাহিদ, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। ১৭ মে
ছবি: পিএমও

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি তুলে ধরে সম্পাদক পরিষদের কয়েকজন সদস্য বৈঠকে বলেছেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা জানিয়েছেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী সম্পাদক পরিষদকে আশ্বস্ত করেছেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করবেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ এবং তাঁর সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নামে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সম্পাদক পরিষদের নেতারা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের অনুভূতির সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না থাকায় সম্পাদক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

গণতন্ত্রপরায়ণ আইন করা হবে

আলোচনার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর সাংবাদিকদের বলেন, আইনকানুনের মধ্যে যে অগণতান্ত্রিকতার অংশগুলো আছে, সেগুলো সম্পর্কে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। অনেকগুলো বিষয়ে পর্যালোচনা করা দরকার, সেগুলো প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন। একটি গণতান্ত্রিক ‘মিডিয়া রেজিম’ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে জুন মাসজুড়ে কাজ করে জুলাইয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। তার আলোকে একটি গণতন্ত্রপরায়ণ আইন প্রণয়ন করার বিষয়ে তাঁরা সম্মত হয়েছেন।

অন্য যেসব ত্রুটিবিচ্যুতি চর্চার মধ্যে রয়েছে, সেগুলো থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, তার ওপর গুরুত্বারোপের কথা জানান নিউ এজ সম্পাদক। তিনি বলেন, সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আচরণ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পাদকেরা তাদের সঙ্গে এনগেজ থাকবেন।

বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের পক্ষে আরও ছিলেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর সম্পাদক রুশো মাহমুদ।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। পরে প্রধানমন্ত্রী সম্পাদক পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।