
তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দুই বছরেও যশোরের অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পরিতোষ কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি স্থানীয় সরকার বিভাগ।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, যশোরের উপপরিচালক মো. জহুরুল হক পরিতোষ কুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে ২০১৩ সালের ২৯ মে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) বিনা মূল্যের ধানবীজ পরিতোষ কৃষকদের কাছে বিক্রি করেছেন। স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের (এলজিএসপি) আওতাধীন দুটি প্রকল্পের কাজ আংশিক করে তিনি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সুন্দলী ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ ৮৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের বিপরীতে প্রকল্প গ্রহণের জন্য ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে তিনি টনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ১১ জন দুস্থ নারীর চাল আত্মসাৎ করেন এবং ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা ফেরত দেন। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) ও এলজিএসপির আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে তিনি অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় ইউএনডিপির অর্থে গৃহীত ৭১ লাখ টাকার প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ-সংক্রান্ত অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগে পরে ইউএনডিপির কর্মকর্তারা পরিতোষকে দুই লাখ টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেন। পরিতোষ টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রিজিবুল ইসলাম জানিয়েছেন।
এরপর পরিতোষ কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক ২০১৩ সালের ১৭ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন। কিন্তু এ পর্যন্ত পরিতোষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিতোষ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোর যশোরের অভয়নগর প্রতিনিধি মাসুদ আলম হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি। সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি-২) আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিহ্রাস প্রকল্পের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ নিয়ে মাসুদ আলমের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ২০১৩ সালের ২০ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পরিতোষ ওই বছরের ২৮ মার্চ মাসুদ আলমের ওপর সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেন। সন্ত্রাসীরা মাসুদ আলমের বাঁ হাত ও পা ভেঙে দেয়। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
গত ২৩ নভেম্বর নওয়াপাড়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, মুক্তিযোদ্ধা মোল্যা ওলিয়ার রহমাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে যশোর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২ ডিসেম্বর পরিতোষকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিনে ছাড়া পান।
যশোর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিতোষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন পরিতোষ। সে সময় একটি হত্যা মামলায় আসামিও করা হয় তাঁকে। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ওই দিন অভয়নগর উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি ইকরাম হোসেন গাজী খুন হন মনিরামপুর উপজেলার দিগঙ্গা গ্রামে। ইকরাম হত্যার ঘটনায় পরিতোষ ছিলেন অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। পরে পরিতোষ যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। এরপর বিএনপির সমর্থন নিয়ে
ইউপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৎকালীন যশোর-৬ আসনের সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ শেখ আবদুল ওহাবের সঙ্গে সখ্য গড়েন এবং আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে পরিতোষ সুন্দলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।