বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ছাত্রলীগ নেতাদের প্রশ্রয়ের কারণে হাসপাতালকে স্থায়ীভাবে দালালমুক্ত করতে হিমশিম খেতে হয়। অতীতে বিভিন্ন পরিচালক দালাল চক্র উচ্ছেদে নানা পদক্ষেপ নিয়েও ব্যর্থ হন।

দালালের পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা, হাসপাতাল আঙিনায় হকার প্রবেশসহ নানা বিষয়ে সংগঠনের নেতারা হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ আছে।

চমেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘দালালেরা হাসপাতালের স্টাফ সেজে রোগীদের কাছ থেকে ওষুধের স্লিপ নিয়ে যায়। এ তথ্য আমার কাছে এসেছে। তারা তিন হাজার টাকার ওষুধে আট হাজার টাকা নেয়। পরে ওষুধের দোকানের সঙ্গে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে।’ তিনি স্টাফদের জন্য পৃথক পোশাক করার কথা ভাবছেন বলে জানান।

দালাল চক্রের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ রোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা। এদের পেছনে হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকারীরা রয়েছেন।
আখতার কবির চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দালাল চক্রের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ রোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা। এদের পেছনে হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকারীরা রয়েছেন। এর প্রতিকার হওয়া দরকার।

১ হাজার ৩১৩ শয্যার চমেক হাসপাতালে দিনে প্রায় তিন হাজার রোগী থাকে। এখানে গড়ে ছোট-বড় ১০০ অস্ত্রোপচার হয়।

২ হাজার টাকার ওষুধ প্রায় ৮ হাজার

চট্টগ্রাম নগরের আইস ফ্যাক্টরি রোডের বস্তিতে থাকেন দিনমজুর আজগর আলী। স্ত্রী রত্না বেগমের প্রসববেদনা উঠলে ১৮ আগস্ট রাত ১০টায় তাঁকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। অস্ত্রোপচার করাতে হবে জানিয়ে এক ওয়ার্ডবয় চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁর হাতে ওষুধের একটি স্লিপ ধরিয়ে দেন। ওয়ার্ড থেকে অপর এক ব্যক্তি আজগরকে ওষুধের স্লিপসহ পথ দেখিয়ে নিয়ে যান।

পরদিন সকালে আজগরের সঙ্গে প্রসূতি বিভাগের সামনে এই প্রতিবেদকের দেখা। তিনি বলেন, ‘ওষুধের স্লিপটি নিয়ে এক লোক আমাকে পূর্ব গেটের একটি দোকানে নিয়ে যান। ওষুধের দাম সাড়ে সাত হাজার টাকা নেন ওই দোকানি। আশপাশের অনেকে বলছেন, ওষুধের দাম বেশি নিয়েছে।’

চিকিৎসকদের মতে, সিজারের ক্ষেত্রে হাসপাতালের সরবরাহ করা ওষুধের বাইরে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হতে পারে।

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাহানারা চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করতে সাধারণত তিন থেকে চার হাজার টাকার ওষুধ লাগে। আমরা এখানে অর্ধেকের বেশি ওষুধ হাসপাতাল থেকে দিয়ে থাকি। সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। কিন্তু রোগীরা দালালের খপ্পরে পড়ে যায়। আবার রোগীর ওষুধ চুরিও হয়।’

দালাল চক্রের কার্যক্রম বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে তিন দিন হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগ, সার্জারি বিভাগ ও অর্থোপেডিক বিভাগে অবস্থান করেন এই প্রতিবেদক। এ সময় ব্যবস্থাপত্র ধরতে দালালদের অভিনব সব কায়দা দেখা যায়।

প্রসূতি ওয়ার্ডে ‘রোগী ভর্তি ফরম ও রোগী বৃত্তান্ত’ নামে একটি ছাপানো কাগজ থাকে। সেখানে ওয়ার্ডবয় রোগীর নাম-ঠিকানা লেখেন। ওয়ার্ডবয়ের সামনে উপস্থিত থাকেন ওষুধের দোকানের প্রতিনিধি বা দালাল।

সরেজমিনে দেখা যায়, দালালদের ভয়ে তটস্থ থাকেন চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়রা। দালালদের হাতে ব্যবস্থাপত্র না দিলে নালিশ যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদে। অতীতে দু-একজনকে ছাত্র সংসদ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করা হয়।

ওয়ার্ডবয়দের সরদার হিসেবে পরিচিত আমির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দালাল দেখলে আমরা বের করে দিই। ছোট চাকরি করি, নানামুখী চাপে থাকি।’

‘দালাল দেখলে আমরা বের করে দিই। ছোট চাকরি করি, নানামুখী চাপে থাকি।’
আমির হোসেন, ওয়ার্ডবয়দের সরদার হিসেবে পরিচিত

২৫ দোকান, ৫৮ দালাল, সিরিয়াল নির্ধারণ লটারির মাধ্যমে

দালালনির্ভর ২৫টি দোকানের অবস্থান হাসপাতালের পূর্ব গেটে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, হীরা ফার্মেসির দালাল হলেন স্বপন, উত্তম ও মিলন। এটির মালিক নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরু। দোকানমালিকদের অলিখিত নেতা তিনি। নিশাদ ফার্মেসি ও নোভা ফার্মেসিও নূর মোহাম্মদ তত্ত্বাবধান করেন। নিশাদ ফার্মেসির হয়ে আশিক এবং নোভার হয়ে নূর হোসেন ও পলাশ হাসপাতালে রোগী ধরেন।

এ ছাড়া সজীব ফার্মেসির পক্ষে সজল ও ফরিদ, লাজ ফার্মেসির পক্ষে সেলিম ও হারুন; ফেনী ফার্মেসির পক্ষে হানিফ ও মিরু; অর্ক ফার্মেসির জন্য সালাহউদ্দিন ও নয়ন; তাহা ফার্মেসির রাজু, লিটন ও বুলবুল; সিকদার ফার্মেসির রয়েল, মিন্টু ও দুলাল; জনতা ফার্মেসির জিকু ও বাবু; সানন্দা ফার্মেসির ওয়াসিম; রিনা ফার্মেসির সঞ্চয় ও নিতাই; ন্যাশনাল ফার্মেসির উত্তম, তপন ও নিতাই; জয় ফার্মেসির রুবেল ও উত্তম; মেডিসিন ফার্মেসির নিলয়, মিতুল ও ইরানী; একুশে ফার্মেসির বাবু, সজীব ও জাহাঙ্গীর; সিটি ফার্মেসির শাহজাহান, ফারুক ও সাইফুল; বিকে ফার্মেসির উৎপল ও সুমন; সাহা ফার্মেসির স্বয়ন; সবুজ ফার্মেসির জসিম, আনোয়ার, মৃদুল ও সুমন; সাহান ফার্মেসির নুনু বাবু ও নিমাই; জয়নাব ফার্মেসির কার্তিক ও ফারুক; সুমন ড্রাগ ফার্মেসির তপন ও ওমর; লোটাস ফার্মেসির জাহাঙ্গীর ও বাবু এবং রাঙ্গুনিয়া ফার্মেসির পক্ষে রাসেল, সুমন, এমদাদ ও জসিম কাজ করেন।

প্রসূতি ওয়ার্ডে ২৫ দোকানের সিরিয়াল নির্ধারণ চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। একজন একটা স্লিপ নিয়ে বের হয়ে গেলে পরবর্তী সিরিয়ালের দোকানের দালাল ওয়ার্ডবয়ের সামনে উপস্থিত হন। ওয়ার্ডের ফটকের সামনে সব দালাল রোগীর অভিভাবকদের সঙ্গে অপেক্ষায় থাকেন।

সিজার, স্বাভাবিক প্রসব, জরায়ুর অস্ত্রোপচার, হাঁড়ভাঙা, অন্যান্য সার্জারিসহ সব মিলে দিনে পাঁচ-ছয়টি ব্যবস্থাপত্র পায় একেকটি দোকান।

প্রসূতি বিভাগের বাইরে সার্জারি ও অর্থোপেডিকের সিরিয়াল নির্ধারণ করা হয় লটারির মাধ্যমে। প্রতিটি দোকানের নাম কাগজে লিখে লটারি হয়। প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে মেডিকেল পূর্ব গেট কেনটাকি রেস্তোরাঁর নিচে এই লটারি হয়। এরপর সবাই হাসপাতাল ঢোকে। সার্জারিতে শনি, রবি ও সোমবার অস্ত্রোপচার হয়। এ ছাড়া অর্থোপেডিকে প্রায় প্রতিদিন ছোট-বড় অস্ত্রোপচার হয়। দালালদের উৎপাত রয়েছে নিউরো সার্জারি বিভাগেও।

চাঁদা সংগ্রহ ও ভাগ-বাঁটোয়ারা

দালাল চক্রের মাধ্যমে ব্যবসা করা ২৫ দোকান থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার দুই হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এভাবে মাসে দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া হাসপাতাল থেকে রোগী ও লাশ পরিবহনে প্রতিটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স থেকে মাসে ৭০০ টাকা করে তোলা হয়।

হাসপাতালের আঙিনায় প্রতিদিন বেলা আড়াইটার পর বালিশ, বেডশিট, লুঙ্গি, প্লাস্টিকের সামগ্রী, ফল, ডাবসহ নানা সামগ্রীর ভাসমান দোকান বসানো হয়। এসব দোকান থেকেও তোলা হয় চাঁদা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ওষুধের দোকান থেকে তোলা চাঁদা চলে যায় ছাত্র সংসদ ও কলেজ ছাত্রলীগের নেতাদের হাতে। অ্যাম্বুলেন্সের চাঁদারও একটি অংশ যায় ছাত্র সংসদে।

অভিযোগমতে, সব চাঁদার একটি অংশ পান উত্তোলনকারী নূর মোহাম্মদ। তিনি থাকেন মেডিকেল ইন্টার্ন হোস্টেল মিজান ছাত্রাবাস লাগোয়া কলাবাগান এলাকায়। তাঁর বাবা ছিলেন মেডিকেলের স্টাফ। তাঁর এক ভাই নাসির উদ্দিন স্টাফ নার্স এবং ডিপ্লোমা নার্সিং সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক। আরেক ভাই মো. বাহার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।

দালালের তৎপরতার বিষয়টি স্বীকার করে নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘২৫ দোকান নিয়ে আলাদা কোনো কমিটি নেই। কিছু দালাল এক-দুটি স্লিপ এনে দেয়, এর বেশি কিছু না। চাঁদা আমি তুলি না।’ অ্যাম্বুলেন্স থেকে চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফিস খরচ চালানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স থেকে মাসে ৭০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এখন ৯৫টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তবে চাঁদার ভাগ কাউকে দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়।’ কিছু গাড়ি নীতিমালার বাইরে নিজের মতো করে রোগী ধরে বলে তিনি স্বীকার করেন।

রোগী ও মরদেহ পরিবহনে নৈরাজ্য কমাতে ২০১৮ সালের মার্চে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। তখনকার মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সব পক্ষের বৈঠকের পর দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নীতিমালা এখন মানেন না অ্যাম্বুলেন্সের মালিকেরা। ওয়ার্ডমাস্টার অফিস থেকে সিরিয়াল নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ও মরদেহ পরিবহনের কথা থাকলেও এখন তা মানা হচ্ছে না।

এর বাইরে পাঁচলাইশ থানার জন্য প্রতি মাসে দোকানগুলো থেকে এক হাজার টাকা করে তোলা হয়। টাকা তোলার দায়িত্বে নূর মোহাম্মদকে সহায়তা করেন তারেক, সুজিত, নয়ন, কামালসহ কয়েকজন।

চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ কেন ওষুধের দোকান থেকে চাঁদা তুলবে? এটা পুরোপুরি মিথ্যা অভিযোগ।’

‘ছাত্র সংসদ দালালদের কাছ থেকে চাঁদা নেয় না। কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে সংসদ ও ছাত্রলীগ জড়িত নয়। তবে দালাল রয়েছে।
প্রীতম সাহা, চমেক ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক

অভিযোগ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ

দীর্ঘদিন ধরে চমেক ছাত্রলীগ ও ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রসূতি বিভাগের দুজন চিকিৎসক বলেন, দালালদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দেয় ছাত্রলীগ। এ জন্য তাদের দাপট কমছে না।

অভিযোগ প্রসঙ্গে চমেক ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক প্রীতম সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাত্র সংসদ দালালদের কাছ থেকে চাঁদা নেয় না। কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে সংসদ ও ছাত্রলীগ জড়িত নয়। তবে দালাল রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা ছাত্ররা মাথা ঘামাই না।’

ছাত্র সংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি সঠিক বলে জানিয়েছেন চমেকের পরিচালক এস এম হুমায়ুন কবীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুঃখের কথা কাকে বলব। এই গ্রুপটার কারণে এখানে অনেক কিছু করা যাচ্ছে না। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুপুরে হাসপাতাল আঙিনায় হকার ঢোকায় তারা। অ্যাম্বুলেন্সে বিশৃঙ্খলার পেছনেও রয়েছে তাদের যোগসাজশ। দালালদের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে। আমরা নিজেরাও ছাত্র ছিলাম। হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু এই গ্রুপটার কারণে এটা খুবই কঠিন।’

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন