কারাবন্দীদের জন্য ৭টি আইসোলেশন কেন্দ্র

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতিতে সারা দেশে বন্দীদের জন্য সাতটি আইসোলেশন কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে সরকার। একই সঙ্গে একটি কারাগারকে পুরোপুরি কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি কারাগারে আসা নতুন বন্দীদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সারা দেশে সাতটি আইসোলেশন কেন্দ্র করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের কারাগারগুলোর বন্দীদের জন্য কিশোরগঞ্জের পুরোনো কারাগার, সিলেট বিভাগের বন্দীদের জন্য সিলেটের পুরোনো কারাগার, চট্টগ্রাম বিভাগের বন্দীদের ফেনীর পুরোনো কারাগার, বরিশাল বিভাগ ও যশোরের জন্য পিরোজপুরের পুরোনো কারাগার, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বন্দীদের জন্য মাদারীপুরের পুরোনো কারাগার, রংপুর বিভাগের বন্দীদের জন্য দিনাজপুরের পুরোনো কারাগার, রাজশাহী বিভাগের বন্দীদের জন্য কারা উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি প্রিজনস রাজশাহী) বাংলোকে আইসোলেশন কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি কারাগারের কিছু সেল ও ওয়ার্ড খালি করে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজি প্রিজনস) কর্নেল মো. আবরার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো কারাগারগুলো ইতিমধ্যে খালি করা হয়েছে। সাতটি আইসোলেশন কেন্দ্রের প্রস্তুতি শেষ। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বন্দীকে সেখানে রাখার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। কোনো বন্দী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে বা উপসর্গ দেখা দিলে তাঁকে আইসোলেশন কেন্দ্রে রাখা হবে।
কারা অধিদপ্তরের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে কারাগারে বন্দীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে স্বজনদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। স্বজনদের কারাগারগুলোর নির্ধারিত নম্বরে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে (তিন ফুট) সীমিত পরিসরে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অবশ্য কারোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর কারাগারে বন্দী সংখ্যাও কমেছে। দেশে কারাগুলোর মধ্যে গত সপ্তাহে বন্দী ছিল ৮৫ হাজারের মতো। গতকাল সে সংখ্যা ৮২ হাজারে নেমে এসেছে।
মাদারীপুর কারাগারে সাক্ষাৎ বন্ধ
মাদারীপুরের পুরো কেন্দ্রীয় কারাগারকে কোয়ারেন্টিন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারা কর্মকর্তারা জানান, সেখানে বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের সরাসরি সাক্ষাৎ বন্ধ রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত আইজি প্রিজনস কর্নেল মো. আবরার হোসেন প্রথম আলো বলেন, সম্প্রতি ইতালিসহ কয়েকটি দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে এসেছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন। তাই মাদারীপুর কারাগারকে পুরো কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে।
মাদারীপুরের কারা তত্ত্বাবধায়ক শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরকার মাদারীপুরের শিবচরকে লকডাউন করেছে। এ অবস্থায় কারা অধিদপ্তরের নির্দেশে বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে স্বজনেরা কারাগারের নির্ধারিত ফোন নম্বরে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন। তিনি জানান, বিদেশফেরত কয়েক ব্যক্তি আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাঁদের ১৪ দিন করে কারাগারে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের কোয়ারেন্টিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাঁর শরীরে করোনার কোনো উপসর্গ না থাকায় তাঁকে সাধারণ বন্দীদের সঙ্গে রাখা হচ্ছে।
কারা সূত্র জানায়, কারাগারের কিছু কর্মচারী শিবচরের গ্রামের বাড়িতে ছুটিতে গেছেন। ছুটি শেষ হলেও করোনা পরিস্থিতিতে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মস্থলে যোগ না দিতে বলা হয়েছে।
সরেজমিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে ঢোকার সময় সাক্ষাৎপ্রার্থী ও কারারক্ষীদের সাবান দিয়ে হাত ধোয়া হচ্ছে। তাঁদের শরীরে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। বন্দীদের সাক্ষাৎকক্ষের সামনে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বেশির ভাগ সাক্ষাৎপ্রার্থী মাস্ক ও গ্লাভস পরে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎকক্ষে প্রবেশ করছেন।
টিকিট বিতরণের দায়িত্বে থাকা কারারক্ষী হৃদয় ইসলাম জানান, করোনার প্রভাবে বন্দীদের সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড় আগের চেয়ে কমে গেছে।
কারাগার সূত্র জানায়, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ৯ হাজার বন্দী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জন কোয়ারেন্টিনে আছেন।
কারা হাসপাতালের চিকিৎসক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন বন্দীদের মধ্যে যাঁদের সর্দি-কাশি ও জ্বরের লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের দুটি বিশেষ কক্ষে রাখা হচ্ছে। ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখার পর তাঁদের সাধারণ বন্দীদের সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎ বন্ধ গাজীপুরে
গাজীপুর কেন্দ্রীয় কারা কমপ্লেক্সের হাই সিকিউরিটি কারাগারে বর্তমানে বন্দী আছেন ৩ হাজার ৩০০, নারী কারাগারে ৮২৪, ১ নম্বর কারাগারে ১ হাজার ৬৩৪ জন ও ২ নম্বর কারাগারে আছেন ৩ হাজার ৩১৩ জন বন্দী।
বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত কারা কমপ্লেক্স এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, দূরদূরান্ত থেকে স্বজনেরা বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। কিন্তু ফটকে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, করোনা পরিস্থিতিতে কারাগারের নির্ধারিত মুঠোফোন নম্বরে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে স্বজনদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে একজন বন্দী স্বজনদের সঙ্গ পাঁচ মিনিট করে কথা বলতে পারবেন।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি ইকবাল হোসেন ও গাজীপুর সংবাদদাতা আল আমিন]