গাছ নিধনে 'রিং' কৌশল

বিজ্ঞাপন
default-image
>

গোড়া ছেঁটে দিলে গাছের পুষ্টি সংগ্রহের ক্ষমতা লোপ পায়। ফলে ধীর ধীরে গাছটি শুকিয়ে মারা যায়।

আছে নানা প্রজাতির গাছ, বাঁশ ও বন্য প্রাণী। কিন্তু ক্রমেই জনবসতি বাড়ছে। গাছ নিধনে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘রিং’ নামের অভিনব কৌশল। এভাবে বনভূমি উজাড় করে জমি দখল চলছে। সেই জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লেবু, কলাসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ও মাছের চাষ চলছে। এ অবস্থা চলছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনে।

বন বিভাগ ও এলাকাবাসী সূত্র জানায়, টিলাভূমির লাঠিটিলা বনের আয়তন ৫ হাজার ৬৩১ দশমিক ৪ একর। সেখানকার প্রায় দুই হাজার একর জমিতে বন বিভাগের করা সেগুনসহ বিভিন্ন বনজ প্রজাতির গাছের বাগান রয়েছে। সুরমা ও হলম্পা ছড়া নামের দুটি প্রাকৃতিক বাঁশমহালও রয়েছে সেখানে। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২ হাজার ৮১৮ দশমিক ৩৯ একর আয়তনের সুরমা মহালে বাঁশের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। আর ২ হাজার ২০০ একর আয়তনের হলম্পা ছড়া মহালে বাঁশের সংখ্যা ১৪ লাখ ৩৯ হাজার। একটি মহাল নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। অপরটি অনেক দিন ধরে ইজারা হচ্ছে না। তা ছাড়া ওই বনে হাতি, উল্লুক, মেছো বাঘ, বানর, চশমাপরা হনুমান, মায়া হরিণ, সাপসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাস রয়েছে। দেশ স্বাধীনের আগে লাঠিটিলা বন দেখভালের জন্য ৩০টি ভূমিহীন পরিবারকে ফরেস্ট ভিলেজার হিসেবে সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রত্যেক পরিবার ফসল চাষাবাদের জন্য আড়াই একর করে ফাঁকা জমি পায়। এখন পরিবারের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫০০ হয়েছে।

গত শুক্র ও শনিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বনের লালছড়া, রুপাছড়া, হায়াছড়া, শুকনাছড়া ও চাম্পাটিলাএলাকায় বেশ কিছু বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন। বনের জমিতে লেবু, কমলা, কলা ও আদার আবাদ করা হয়েছে। কিছু স্থানে টিলার নিচে বাঁধ দিয়ে করা হয়েছে মাছের খামার। লালছড়া, রুপাছড়া ও চাম্পাটিলায় সেগুন, কড়ই, আওয়ালসহ নানা প্রজাতির ২০ থেকে ২৫টি গাছ গোড়া থেকে প্রায় এক ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ছাঁটানো। এ রকম চার থেকে পাঁচটি গাছ শুকিয়ে মরে গেছে।

গাছ ছাঁটানোর বিষয়ে স্থানীয় দুই তরুণের কাছ থেকে ভয়ংকর তথ্য পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তরুণেরা বললেন, মূলত প্রাকৃতিকভাবে গাছ মেরে ফেলার কৌশল এটা। এলাকায় এ কাজকে ‘রিং’ করা বলা হয়। গোড়া ছেঁটে দিলে গাছের পুষ্টি সংগ্রহের ক্ষমতা লোপ পায়। ফলে ধীর ধীরে গাছটি শুকিয়ে মারা যায়। জায়গাটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। এরপর সেখানে বিভিন্ন ফলের গাছ রোপণ করা হয়। এ অপকর্মে কিছু বন কর্মকর্তা জড়িত। সরাসরি গাছ কাটলে বন বিভাগ মামলা করবে, তাই এ কৌশল।

লাঠিটিলা এলাকার ফরেস্ট ভিলেজারদের প্রধান (হেডম্যান) আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘গাছের আশপাশে ফাঁকা স্থানেই তো ফলের আবাদ করা যায়। তাহলে রিং করে গাছ মারার দরকার পড়বে কেন? আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’ বনে বসতির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে আবদুর রাজ্জাক বলেন, তাঁর বাবা ফরেস্ট ভিলেজার ছিলেন। তাঁরা পাঁচ ভাই। বাবার মৃত্যুর পর সব ভাই আলাদা বাড়িতে থাকেন। বংশবৃদ্ধির কারণে বনে মানুষ ও বসতির সংখ্যা বেড়েছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেকে ফলের চাষ করছেন।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে চাম্পাটিলায় কয়েকটি হনুমানের দেখা মেলে। একপর্যায়ে মানুষের সাড়াশব্দ পেয়ে তারা সটকে পড়ে। এক তরুণ বলেন, দু-তিন বছর আগে চাম্পাটিলায় উল্লুকও দেখা যেত। এরা গাছের ডালে ডালে চড়ে বেড়াত। এখন গাছ কমে যাওয়ায় তাদের আর দেখা মেলে না। আবাসস্থল ও খাদ্যসংকটের কারণে বন্য প্রাণীরা প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসে। বনে মাঝেমধ্যে হরিণ শিকারও চলে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরও তিনজন বাসিন্দা বলেন, বনের এ ক্ষতির জন্য বন বিভাগের কর্মকর্তারাও দায়ী। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বনে বাড়িঘর নির্মাণ, ফলমূল ও মাছ চাষ এবং গাছ চুরির ব্যাপারে সহযোগিতা করেন।

বন বিভাগের জুড়ী রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা সহকারী বন সংরক্ষক আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, লাঠিটিলা একটি সমৃদ্ধ বন। বনে বসতি বাড়ার বিষয়টি তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। দু-তিন মাস আগে তিনি খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দুটি ঘর উচ্ছেদ করেছিলেন। ফল ও মাছ চাষের ব্যাপারে তাঁদের অনুমতি কেউ নেয়নি। তবে বনের এসব ক্ষতিতে বন বিভাগের কোনো লোক জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, লাঠিটিলা বন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। অন্যথায় একসময় পুরো বনটিই লোকালয়ে পরিণত হয়ে যাবে। তবে লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের এ দুর্দশা থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে বন বিভাগকেই করণীয় নির্ধারণ করতে হবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম বলেন, বসতি বাড়ায় বনটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য এটা বড় হুমকি। বনে বসবাসকারী মানুষের অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বনের গাছগাছালি ধ্বংস করে বাণিজ্যিকভাবে ফলের চাষাবাদ বন্ধ করতে হবে। তবেই এ বন বাঁচবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন