default-image

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় অ্যাপ টিকটকের ভিডিও চিত্রে কখনো সোনালি, কখনোবা চকচকে সবুজ চুলের ‘অফু বাই’ গোল হয়ে বসে বলছেন, ‘সানি লিওন কে।’ আবার কখনো মেয়েবন্ধুকে উত্ত্যক্ত করার দায়ে কোনো কিশোরের ঘাড়ে পা তুলে জুতা মুছছেন। কখনো গানের তালে তালে অন্য কোনো টিকটক তারকাকে হুমকি দিচ্ছেন।

‘অফু বাই’-এর প্রকৃত নাম ইয়াছিন আরাফাত (অপু), যিনি এক প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগে গত ৩ আগস্ট ঢাকার উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন। এই উত্তরাতেই ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান খুন হওয়ার পর ঢাকায় প্রথম কিশোর গ্যাংয়ের জোরালো অস্তিত্বের খবর জানা যায়। সর্বশেষ খবর হলো, গত শুক্রবার ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে কিশোর-তরুণদের দুই পক্ষের বিরোধের জেরে একজন নিহত হন, ছুরিকাঘাতের শিকার হয় দুই কিশোর।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা কমেনি, বরং প্রকোপ ও পরিধি—দুই-ই বেড়েছে। এমনকি তারা টিকটক লাইকিকে কেন্দ্র করেও নতুন করে গ্যাং গড়ে তুলছে। টিকটকের নায়িকা বানানোর টোপ দিয়ে কিশোরী ধর্ষণের মতো অপরাধে মামলাও হয়েছে ভাটারা থানায়। কিশোরেরা জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদেও।

বিজ্ঞাপন
কিশোরেরা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা থাকলেও সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর তাতে আগ্রহ নেই। তাই ভালো ভালো আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেসবের বাস্তবায়ন হচ্ছে না
সাবিনা শরমিন, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ। পুলিশ সদর দপ্তরে কিশোর অপরাধের রেকর্ড পাওয়া গেছে ২০১২ সাল থেকে। সে বছর ৪৮৪ মামলায় আসামি ছিল ৭৫১ জন শিশু-কিশোর। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৮২১ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ১৯১ জন। শিশু-কিশোরেরা প্রধানত মাদক, হত্যা ও ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে উন্নয়নকেন্দ্রগুলোয় আছে বলে জানিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র।

২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকা ও এর আশপাশে ১২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর আটটির সঙ্গেই রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। সংস্থাটি আরও জানায়, সারা দেশে আরও কমপক্ষে ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব কটি বাহিনীকে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল।

কেন কিশোরেরা আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে? রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ কিংবা পরিবারে আসলে কী আছে কিশোরদের জন্য? ‘ডাইনামিকস অব জুভেনাইল ডেলিনকোয়েন্সি অ্যান্ড ইটস লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন, অ্যান অ্যানথ্রোপলজিক্যাল স্টাডি’ শিরোনামে এক গবেষণায় (২০১৭ সাল) এ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবিনা শরমিন বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সমাজবিজ্ঞান বলছে, পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও বন্ধুবান্ধব কিশোরদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে। একে বলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হয়েছে। আগে কিশোরেরা প্রকাশ্যে ধূমপান করলেও পাড়ার মুরব্বিরা শাসন করতেন। এখন তাঁরাই ভয় পান। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সঙ্গে অভিভাবকেরা অনেক সময় তাল মেলাতে পারছেন না। সন্তান কী করে সময় কাটায়, ডিজিটাল ডিভাইসে কী করে—তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না। এ ছাড়া কিশোরেরা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা থাকলেও সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর তাতে আগ্রহ নেই। তাই ভালো ভালো আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেসবের বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

এই অঞ্চলে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ নিয়ে প্রথম যে গবেষণাটির খোঁজ পাওয়া যায়, সেটি ১৯৬০ সালের। তখন পুলিশের জন্য ‘স্টাডিজ ইন জুভেনাইল ডেলিনকোয়েন্সি অ্যান্ড ক্রাইম ইন ইস্ট পাকিস্তান’ শিরোনামে একটি গবেষণা করেন তখনকার কলেজ অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার রিসার্চ সেন্টারের গবেষক সালাউদ্দিন আহমেদ। এরপর ছোট-বড় অন্তত ৭০টি গবেষণার সন্ধান পাওয়া গেছে। পাকিস্তান আমলে কিশোরদের করা অপরাধের শীর্ষে ছিল চুরি, তারপর পকেটমারি। গবেষণায় দেখা যায়, কিশোরেরা ক্রমশ মাদক, খুন, ধর্ষণ ও মারামারির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

শিশু উন্নয়ন বোর্ডের বৈঠক হয় বছরে একবার-দুবার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করলে অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো উপস্থিত থাকে। তিনি জানান, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া বিষয়ে তাঁরা কোনো গবেষণা করাননি। তিনি মনে করেন, সব শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রাখা এবং শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরালো করা হলে আইনের সঙ্গে কিশোরদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা কমবে। কিশোর উন্নয়নে অনেকগুলো পক্ষের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে।
সমাজকল্যাণসচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী

নীতিমালা আর আইনের চক্রাবর্ত

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে শিশু-কিশোরদের জন্য জাতীয় শিশু আইন প্রণীত হয়। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে সই করে। এরপর ২০১৩ সালে আসে নতুন শিশু আইন। এর বাইরে শিশু-কিশোরদের নীতিমালা হয়েছে তিনটি। ১৯৯৪ সালে প্রণীত হয় জাতীয় শিশু নীতি। এরপর একই নামে ২০১৩ সালে হয় আরেকটি নীতিমালা। ওই নীতিমালায় আলাদাভাবে কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের প্রসঙ্গ আছে। এর বাইরে রয়েছে জাতীয় শিশু শ্রম নিরসন নীতি, ২০১০।

শিশু আইন, ২০১৩-তে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, শোষণ, অসৎ পথে পরিচালনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। শিশুর কল্যাণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শিশুকল্যাণ বোর্ডের কথাও বলা আছে। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত বোর্ডে জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত একজন এবং সরকার ও বিরোধী দলের দুজন নারী সাংসদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ ১৭ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে এই বোর্ড এখন পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নিয়েছে, জানতে চাইলে সমাজকল্যাণসচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, শিশু উন্নয়ন বোর্ডের বৈঠক হয় বছরে একবার-দুবার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করলে অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো উপস্থিত থাকে। তিনি জানান, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া বিষয়ে তাঁরা কোনো গবেষণা করাননি। তিনি মনে করেন, সব শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রাখা এবং শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরালো করা হলে আইনের সঙ্গে কিশোরদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা কমবে। কিশোর উন্নয়নে অনেকগুলো পক্ষের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বাজেট আছে, কিশোরেরা বিস্মৃত

২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে শিশু-কিশোরদের জন্য জাতীয় বাজেটের অংশ হিসেবে সাতটি মন্ত্রণালয় আলাদা বাজেট করতে শুরু করে। সবশেষে এই তালিকায় মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। বছরওয়ারি বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ে। যেমন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৫ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে এ বরাদ্দ গিয়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার ১৯০ কোটি টাকায়। অবশ্য এ বাজেটের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়ার বড় অংশের বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত।

মন্ত্রণালয়গুলো বাজেটের মূল্যায়নে নিজ নিজ কাজের লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছে। তারপর অনেকেই বলেছে, তারা শিশুদের জন্য বাজেট করতে পারেনি। বাজেট বাস্তবায়নে আরও যেসব অংশীজন আছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় হচ্ছে না। যেমন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, শিশুদের কথা বিবেচনা করে তারা প্রকল্প নিতে পারেনি। স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে তারা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে না। জননিরাপত্তা বিভাগও বলেছে, শিশুকেন্দ্রিক উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব আছে তাদের।

শিশু সংগঠন খেলাঘরের চেয়ারপারসন মাহফুজা খানম বলেন, রাজনীতি, সরকার, সরকারি পদ্ধতি, আইন ও বিধান বাস্তবায়নের যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের মনোজগতের ওপর কিশোরদের উন্নতি নির্ভর করে। সে জায়গায় পরিবর্তন হতে হবে। যেসব দেশ কিশোরদের কথা ভাবে, তাদের বড় অংশই শিশু সংগঠনগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়। বাংলাদেশে শিশু সংগঠনগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা নেই।

সরকারি উদ্যোগে কিশোর কম

দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোরের মধ্যে সরকার লাখ সাতেকের জন্য কোনো না কোনো ব্যবস্থা করতে পেরেছে। এমন একটা হিসাব পাওয়া যায় প্রথম আলোর যুব কর্মসূচির সমন্বয়ক মুনির হাসানের কাছ থেকে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় কিশোরদের জন্য শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ স্কাউটস ও সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণের ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ স্কাউটসের পরিচালক আরশাদুল মুকাদ্দিস প্রথম আলোকে বলেন, মাধ্যমিকে এখন ৫ লাখ ৯২ হাজার ৯০৫ জন স্কাউটিং করেন। সারা দেশের সব স্কুলে স্কাউটিং শুরুর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তাঁরা চেষ্টা করছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য জানান, সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণের আওতায় সোয়া লাখ শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

আর সারা দেশের সব কটি জেলা ও ছয়টি উপজেলায় শিশু একাডেমির কার্যক্রম থাকলেও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সাড়ে ১২ হাজার শিশু। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থী নামমাত্র—নোয়াখালীতে ৫০, নরসিংদীতে ৩৯। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিশু একাডেমির কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা শিশু-কিশোরদের একাডেমিতে আনার ব্যাপারে অনাগ্রহী থাকেন। শুধু দিনের কাজটুকু করে যান।

এর বাইরে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে দুই লাখ শিশুর যুক্ততা আছে, রোবটিকস বা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় আরও কিছু কিশোরের সম্পৃক্ততা দেখা যায়।

ঘটনা ঘটলে তৎপরতা

কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা দেখায়। যেমন গত বছরের আগস্টে একটি ফেসবুক পোস্টে বন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীর ছবিতে মোহাম্মদপুরের ‘মোল্লা রাব্বি’ কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য হা হা ইমোজি দিয়েছিল। এর জের ধরে প্রতিপক্ষ ‘স্টার বন্ড’ কিশোর গ্যাংয়ের ২০ থেকে ২২ জন ছুরি, চাপাতি নিয়ে হামলা করতে বের হয়। তবে হামলার আগেই র‍্যাব তাদের আটক করে। র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরে ১৭ জনকে আটক করে সবাইকে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়ে টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠান।

র‍্যাব জানায়, সে বছরের আগস্টে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ রকম ২০০ কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বাইরে ওই একই সময় শুধু হাতিরঝিল থেকেই শতাধিক কিশোরকে ধরে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠায় পুলিশ।

সবশেষ গত ১৭ অক্টোবর রাজারবাগে ঢাকা মহানগর পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম কিশোর গ্যাং সদস্যদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। এর সদস্যদের অবস্থান ও গতিবিধি নজরদারি করতে বলেন পুলিশকে। এতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

এর বাইরে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের প্রবণতা হলো সেলুনগুলোয় হানা দেওয়া। গত বছর সাভার, টাঙ্গাইল ও মাগুরায় পুলিশ এবং জনপ্রতিনিধিরা চুলে ‘বখাটে কাটিং’ না দিতে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। কিশোরদের ধরে চুল কেটে দেওয়ার ভিডিও চিত্র ভাইরাল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন
অভিভাবকেরা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। কারণ, সমাজে অর্থ-বিত্তশালীদের মূল্যায়ন বেশি হতে দেখছেন তাঁরা। একটা সময় ভালো ছাত্র, গাইয়ে, নৃত্য বা আবৃত্তিশিল্পীদের কদর ছিল; এখন নেই। কিশোরদের সামনে কোনো রোল মডেল নেই। অভিভাবক মুঠোফোনে ব্যস্ত, ছেলেমেয়েরাও
মোহাম্মদ কায়কোবাদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গণিত অলিম্পিয়াডের সংগঠক

পরিবার কী করছে

কলকাতার ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর জনপ্রিয় গানে আছে, ‘ছেঁড়া ঘুড়ি রঙিন বল/ এইটুকু সম্বল/ আর ছিল রোদ্দুরে পাওয়া বিকেলবেলা/ বাজে বকা রাত্রিদিন অ্যাস্টেরিক্স টিনটিন/ এলোমেলো কথা উড়ে যেত হাসির ঠেলায়।’ এই গান অভিভাবকদের ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা পড়া কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কিশোর-কিশোরীদের অনেকেই এখন আর এর প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পায় না।

বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানের প্রতি মনোযোগ নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গণিত অলিম্পিয়াডের সংগঠক মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভিভাবকেরা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। কারণ, সমাজে অর্থ-বিত্তশালীদের মূল্যায়ন বেশি হতে দেখছেন তাঁরা। একটা সময় ভালো ছাত্র, গাইয়ে, নৃত্য বা আবৃত্তিশিল্পীদের কদর ছিল; এখন নেই। কিশোরদের সামনে কোনো রোল মডেল নেই। অভিভাবক মুঠোফোনে ব্যস্ত, ছেলেমেয়েরাও।

মুঠোফোন বা প্রযুক্তির অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। চলতি বছরের আগস্টে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) গ্রেপ্তার করেছে এক কিশোর এবং এক কৈশোর উত্তীর্ণকে। সিটিটিসির উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভিডিও গেমস খেলতে খেলতে তাদের মধ্যে অস্ত্র চালানো শেখার ইচ্ছা জাগে। এরপরই জঙ্গিগোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ে তারা ঘর ছাড়ে। এই দলের এক সদস্য অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

উত্তরার কিশোর আদনান খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার এক তরুণ বলছিলেন, কিশোরদের সামনে আসলে রোল মডেল নেই। আদনান যখন খুন হয়, তখন তিনি উত্তরার একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। এখন আইন বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে পড়ছেন। অক্টোবরের শেষ ভাগে তিনি প্রথম আলোকে আরও বলেন, কিশোরদের জীবনের লক্ষ্য ‘বড় ভাই’ হওয়া। রাজনৈতিক দলে থাকা বড় ভাইদের ক্ষমতা কিশোরদের প্রলুব্ধ করছে। তাঁর ‘কেস মেট’রা আদনান খুনের পরও গ্রেপ্তার হন, এলাকায় মাদক বেচার অভিযোগ আছে তাঁদের বিরুদ্ধে। প্রায়ই তাঁদের দেখা যায় মিছিল-মিটিংয়ে।

দারিদ্র্য, মা-বাবার বিচ্ছেদ, বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার কারণেও বিপদে পড়ছে কিশোরেরা। তাদের দেখার কেউ নেই।

এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল ইয়াছিন আরাফাত ওরফে অপুর প্রসঙ্গ দিয়ে। কয়েক মাস আগে তাঁর বয়স ১৮ পেরিয়েছে। ইয়াছিন ঢাকায় গ্রেপ্তারের পর জামিন নিয়ে নানা-নানির কাছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে ফিরে গেছেন। মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। এখন ছোট ভাই অন্তরের সঙ্গে জুটি বেঁধে আগের মতোই ভিডিও বানান। তবে ইয়াছিনের নানা আবদুল জব্বার প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর নাতি নিতান্ত কায়ক্লেশে বড় হয়েছেন। তিনি ছিলেন বিআরটিসির বাসচালক। নাতি ছোট থাকতেই মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। দশম শ্রেণির পর পড়াশোনা আর এগোয়নি। টিকটকের অভিনয়, নাচ, গান—কোনোটাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার সুযোগ হয়নি। নাতি টিকটকে কী করে, তিনি জানেন না।

২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার শিশু আদালতে প্রবেশনারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন সুমন মধু। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সময়কালে বেশির ভাগ মামলাই ছিল মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের। আদালত সাধারণত শিশু-কিশোরদের জামিন দিয়ে দিতে চান। বেশির ভাগ সময় এদের কোনো অভিভাবক পাওয়া যেত না। দিনের পর দিন তাই কিশোরদের টঙ্গীতে উন্নয়নকেন্দ্রে থেকে যেতে হতো।

অনেক পরিবার এখন এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। একজন নারী ব্যাংক কর্মকর্তা তাঁর সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন। তিনি বললেন, ‘ছেলেটাকে বাধ্য হয়েই মোবাইল দিয়েছিলাম। বদলে গেছে একদম। পাবজি খেলত। সারা দিন দরজা বন্ধ করে থাকে এখন। অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে। এখন টাকা চাইতে শুরু করেছে।’ এই নারী ব্যাংক কর্মকর্তা বারবার আক্ষেপ করে বললেন, ‘দেশে এত বিদ্বান মানুষ। তারা কি কোনো উপায় খুঁজে বের করতে পারছেন না?’

মন্তব্য পড়ুন 0