বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
গতকালের ৬ জনসহ মোট নিহত ২৭। গতকালই আহত হয়েছেন অন্তত ১০৬ জন। ১০ কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত।

রায়পুরা আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়পুরার চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নে নিয়মিত টেঁটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটে। সাধারণত দুই দলে ভাগ হয়েই গ্রামবাসী এসব সংঘর্ষে লিপ্ত হন। রাজনৈতিক অভিভাবকেরা কখনো এই দলে, কখনো ওই দলে অবস্থান নেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দল যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, তার পক্ষে কাজ করার নির্দেশ ছিল। দলের বিদ্রোহীদের ঠেকাতে দেশের অনেক জায়গায় দলীয় নেতাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে নরসিংদীতে দলের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ ছিল না।

গতকাল বৃহস্পতিবার রায়পুরার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বালুয়াকান্দি এলাকার মো. সালাউদ্দিন মিয়া (৩০), সোবহানপুর এলাকার মো. জাহাঙ্গীর হক (২৬) ও বটতলিকান্দী এলাকার মো. দুলাল মিয়া (৩০)। নিহত সালাউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর হক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রাতুল হাসানের সমর্থক। আর দুলাল মিয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হকের সমর্থক।

এর আগে ৪ নভেম্বর সদর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল আলোকবালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন ও গত ২৮ অক্টোবর রায়পুরার চরাঞ্চল পাড়াতলী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে দুজন ও পরে আরেকজন মারা যান।

এই নয়জনের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। তিন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন দলের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। এই প্রাণহানির মূলে ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যা নির্বাচন সামনে রেখে মীমাংসিত হওয়ার বদলে সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইমান উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই চরাঞ্চলগুলোতে সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলছে। সঙ্গে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এত বছরে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে দেখিনি। সবই আপস হয়ে যায়। যাঁরা এগুলো থামাবেন, তাঁরাই এসব নিয়মিত উসকে দিচ্ছেন। চার পাঁচটা বিচার হলেই এসব থেমে যেত।’

সদর উপজেলার চরাঞ্চল চারটি। এর মধ্যে আলোকবালী, চরদীঘলদী ও করিমপুরে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সাধারণত দুই দলে ভাগ হয়েই গ্রামবাসী এসব সংঘর্ষে লিপ্ত হন। কিন্তু যতটা রাজনৈতিক কারণ, তার চেয়েও বেশি আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা দেখা যায় সদরের চরাঞ্চলগুলোতে।

নরসিংদী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, চরাঞ্চলগুলোর এই সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। মূলত আধিপত্য বিস্তারের জন্যই দুই দলে ভাগ হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটা ঠিক, রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে তারা এসব চালিয়ে যেতে পারছে। এসব থামাতে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আমরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছি না।’

এসব মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনটি ঘটনাই ঘটেছে দুর্গম চরাঞ্চলে। এসব এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো নয়। কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশের পক্ষে ঘটনাস্থলে যাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তরা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে নয়জনের মৃত্যু এসব অঞ্চলে অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়টিই প্রতিষ্ঠা করে।

এই বিষয়ে জানতে নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজিমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান বলেন, চরাঞ্চলে আগে একটা সময় শুধু টেঁটার ব্যবহার ছিল। কিন্তু বর্তমানে টেঁটার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। ১৫ দিনে ৯ জন মারা গেছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। এসব মৃত্যু সত্যিই আতঙ্কের।

সাহেব আলী পাঠান আরও বলেন, প্রায়ই চরাঞ্চলগুলো থেকে টেঁটা, ককটেল ও পাইপগান উদ্ধার করছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশিক্ষণ নিয়ে এসব তারা এখন নিজেরাই তৈরি করতে শিখে গেছে। নানা সময়ে পুলিশের অভিযান হচ্ছে। ভৌগোলিকভাবেই চরাঞ্চলগুলো নিরবচ্ছিন্ন এবং পাশেই অন্য জেলার চরাঞ্চল। এর জন্য তারা সহজেই পুলিশের চোখ এড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিচরণ করতে পারে। এভাবেই তারা আগ্নেয়াস্ত্রের সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারে। যারা এসব সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে স্থানীয় লোকজন সচেতন না হলে এটা বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন