default-image

নরসিংদীর শিবপুরের জয়নগরে প্রায় চার বিঘা আয়তনের একটি লাল মাটির টিলা কাটা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে টিলাটি কিনে নিয়ে তা সমতল ভূমিতে পরিণত করছেন এসবি গ্রুপের চেয়ারম্যান বশির আহমেদ। আইনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কয়েকজন দালালের সহযোগিতায় তিনি এই টিলা কাটছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে টিলা কাটার খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হ‌ুমায়ূন কবিরের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। এ সময় টিলা কাটা ও মাটি পাচারের অপরাধে তিনজনের প্রত্যেককে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সাজা পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন মনোহরদী উপজেলার কেরানিনগর এলাকার ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ (৩৫), সাভার থানার অফিস বাজার এলাকার সেলিম (৩৬) ও নাটোরের বড়াই গ্রামের ফুলতলী এলাকার মিলন (৩৬)।

পাহাড়ি এলাকা বলে পরিচিত জয়নগর ইউনিয়নে টিলা আছে দুই শতাধিক। পুরো উপজেলায় এর সংখ্যা হাজারের বেশি। বাঘাব, জয়নগর, চক্রধা ও যশোর—এই চার ইউনিয়নে এসব টিলার অবস্থান। এসব টিলার অধিকাংশেরই উচ্চতা ২০-৩৫ ফুটের মধ্যে। চলতি বছর সব মিলিয়ে শিবপুরে ১০-১২টি টিলা কাটা হয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, দড়িপুরা গ্রামে দড়িপুরা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের পাশে পাহাড়ি এলাকায় এসবি গ্রুপের চেয়ারম্যান বশির আহমেদ কিছুদিন আগে প্রায় চার বিঘার টিলাটি কেনেন। এক মাস ধরে দিন-রাত খননযন্ত্র (ভেকু) দিয়ে টিলাটি কাটা হচ্ছিল লটকনের বাগান করার জন্য। তবে ভবিষ্যতে শিল্পকারখানা করার ইচ্ছা তাঁর। টিলাটিতে দুই শতাধিক গাছ ছিল। এর মধ্যে শত বছরের কিছু পুরোনো আম ও কাঁঠালগাছও ছিল। পাশেই আরেকটি টিলা ছিল, সেটিও কেটে ফেলা হয়েছে কয়েক বছর আগে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, খননযন্ত্রের (ভেকু) মাধ্যমে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত, কখনো দিনের বেলায়ও লাল মাটির এসব টিলা কাটা হচ্ছে। এরপর ট্রাকে করে এসব মাটি নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণত এসব মাটি কাজে লাগে সিরামিক কারখানায়। তবে কিছু মাটি ব্যবহৃত হয় নিচু এলাকা ভরাটের কাজে। মূলত কাঁচা টাকার লোভে স্থানীয় লোকজন নিজেদের টিলা কাটছেন বা কাটতে দিচ্ছেন। একটা টিলায় হাজার হাজার ট্রাক লাল মাটি পাওয়া যায়। সুবিধা পেয়ে প্রশাসনের লোকজন এসব দেখেও দেখে না।

স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিবপুরে কোনোভাবেই টিলা কাটা থামানো যাচ্ছে না। অবৈধভাবে একের পর এক লাল মাটির টিলা কেটে সমতল ভূমিতে রূপান্তর করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে এসবি গ্রুপের চেয়ারম্যান বশির আহমেদ বলেন, ‘এই টিলা আমি কিনে নিয়েছি। আমার জায়গা আমি কেটে সমান করছি, এতে সমস্যার কী আছে? আর জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাদিম সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই টিলা কাটা হচ্ছে।’

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাদিম সরকার বলেন, এগুলোকে টিলা না বলে উঁচু-নিচু জায়গা বললে ভালো হয়। গ্রামের মানুষ ফসল চায়, টিলা চায় না। লাল মাটির এই এলাকায় লটকনের ফলন ভালো হয় আর লটকনের জন্য সমতল ভূমি লাগে। সে জন্যই টিলাগুলো কেটে ফেলতে চাইছে গ্রামের মানুষ। তিনি আরও বলেন, ইউএনও সাহেব ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে যে তিনজনকে সাজা দিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ড্রাইভার ও গরিব মানুষ। তাঁদের সাজা দিয়ে আর যাই হোক টিলা কাটা বন্ধ করা যাবে না।

নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন কাজে পাহাড়-টিলা কাটার কোনো সুযোগ নেই। এটি অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ।

ইউএনও হ‌ুমায়ূন কবির জানান, টিলা কাটা ও মাটি পাচারের অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের অধিকার কারও নেই। টিলা কাটার বিষয়ে কোনো তথ্য পেলে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0