বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাতভর কষ্টের নৃত্য

দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল মো ইকবাল হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি জেনেছেন বছর পাঁচেক আগে আজম খানের হোটেল থেকে এক নারী লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর তাঁকে আমিরাত থেকে বের করে দেওয়া হলে তিনি ওমানে চলে যান।


সূত্র জানায়, পাচারের শিকার তিন নারী চলতি বছরের জুন মাসে দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল অফিসে যোগাযোগ করেন। তাঁদের একজন নবম শ্রেণিপড়ুয়া এক কিশোরী।


পাচারের শিকার ওই কিশোরীকে গত ২২ জুন ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। মুঠোফোনে কিশোরীটি প্রথম আলোকে জানায়, তার এক প্রতিবেশী তাকে এক নৃত্য প্রশিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই প্রশিক্ষক তাকে দুবাইয়ের হোটেলে চাকরির লোভ দেখিয়ে আজমের ভাই নাজিমের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেন। কিশোরীর ভাষায় অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে সে পাসপোর্ট হাতে পায়। দুবাই পৌঁছানোর পর তার ঠাঁই হয় সিটি টাওয়ার হোটেলের একটি জানালাবিহীন কক্ষে। ওই হোটেলে সে ছাড়া আরও প্রায় ২০ নারী ছিলেন। প্রতিদিন রাত নয়টা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত তাদের আরবি, হিন্দি ও ইংরেজি গানের সঙ্গে নাচতে হতো। অতিথিরা চাইলে তাঁদের সঙ্গে রাত কাটাতে হতো। দুবাই ক্লাবের সুপারভাইজার আলমগীর ২ হাজার ২০০ দিরহামের বিনিময়ে তাদের ক্লায়েন্টের হাতে তুলে দিতেন। কেউ রাজি না হলে বেদম মারপিট করা হতো।

আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং সেখানে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকেরা প্রথম আলোকে বলেছেন, দুবাইতে ড্যান্স বার বৈধ। বাংলাদেশিদের কেউ কেউ সে সুযোগ নিয়ে নারীদের বন্দী করে যৌনকর্মে বাধ্য করছেন।
আমিরাতের বাংলাদেশ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাসির তালুকদার দুই যুগের বেশি সময় ধরে দেশটিতে আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েরা খুব দ্রুত পাসপোর্ট ও ভিজিট ভিসা পাচ্ছেন। বিমানবন্দরে অভিবাসনও পার হচ্ছেন খুব সহজে। সবগুলো পক্ষকেই জবাবদিহি করা দরকার।

সিআইডির নড়েচড়ে ওঠা

ওই কিশোরীর বিষয়ে দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল মো ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েরা তাঁদের হোটেলের ঠিকানা দিয়ে জানায় তাঁরা আটকা পড়েছে। তাঁদের খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। এরপর বাংলাদেশি কমিউনিটির সহযোগিতায় তাঁদের উদ্ধার করে দেশে পাঠানো হয়।


দুবাই পুলিশও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপরই কাজ শুরু করে সিআইডি। জানতে পারে আজম খান বাংলাদেশেই আছেন। তাঁর অবর্তমানে দুবাইয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে তাঁরই দুই ভাই নাজিম ও এরশাদ। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথাবার্তার পর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মৃণাল কান্তি সাহা গত ২ জুলাই লালবাগ থানায় একটি মামলা করেন। এজাহারে আজমদের তিন ভাই ছাড়াও আল আমিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড, মো স্বপন হোসেন, নির্মল দাস (এজেন্ট), আলমগীর (দুবাই ক্লাবের সুপারভাইজার), আমান (এজেন্ট) ও শুভকে (এজেন্ট) আসামি করা হয়।


এজাহারের অভিযোগ, আজম খান, তাঁর দুই ভাইসহ মামলার আসামিরা দুবাইয়ের হোটেল ও ড্যান্স বারে মেয়েদের যৌনকর্মে বাধ্য করতেন। এই তিনজনের প্রতিনিধিরা দেশের বিভিন্ন নাচের ক্লাব বা সংগঠন থেকে মেয়েদের সংগ্রহ করে কাজ দেওয়ার নাম করে তাঁদের দুবাই পাঠাচ্ছিলেন।

এজাহারের অভিযোগ, আজম খান, তাঁর দুই ভাইসহ মামলার আসামিরা দুবাইয়ের হোটেল ও ড্যান্স বারে মেয়েদের যৌনকর্মে বাধ্য করতেন। এই তিনজনের প্রতিনিধিরা দেশের বিভিন্ন নাচের ক্লাব বা সংগঠন থেকে মেয়েদের সংগ্রহ করে কাজ দেওয়ার নাম করে তাঁদের দুবাই পাঠাচ্ছিলেন।

দুবাই পুলিশের দেওয়া তথ্য ধরে সিআইডি গত জুলাই মাসে আজম খান এবং তাঁর দুই সহযোগী ডায়মন্ড ও আনোয়ার হোসেন ওরফে ময়নাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হন আজমের এ–দেশীয় প্রতিনিধি নির্মল সরকার ও মো ইয়াছিন।

জবানবন্দি

আজম খান এবং এ দেশে তাঁর দুই প্রতিনিধি নির্মল সরকার ও মো ইয়াছিন আদালতে সম্প্রতি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ওই জবানবন্দিতে তাঁরা গডফাদার হিসেবে বাড্ডার সজীব ও ময়মনসিংহের অনীকের নাম দিয়েছেন।


আজম খান জবানবন্দিতে বলেছেন, লালবাগের স্বপন, আলামিন ওরফে ডায়মন্ড, বংশালের ময়না, চট্টগ্রামের মাহাফুজ ও ময়মনসিংহের অনীক তাঁকে মেয়ে সংগ্রহের কাজে সাহায্য করেন। বাড্ডার সজীব ও ময়মনসিংহের অনীকেরও দুবাইতে ড্যান্স বার আছে।


আজমের ভাই নাজিমের বন্ধু মো. ইয়াছিন ও নির্মল ড্যান্স একাডেমির নির্মল সরকার তাঁদের জবানবন্দিতে বলেন, তাঁরা আজম খান ছাড়াও সজীবের জন্য নারী পাচার করেছেন। একজন খ্যাতনামা নৃত্যসংগঠক, তাঁর সহযোগী এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কোরিওগ্রাফারসহ দুজনকে তাঁরা টাকার বিনিময়ে ‘আর্টিস্ট’ দিয়েছেন।


সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অনেকের নাম বলেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন