default-image

রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী খাল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অস্ত্রগুলো সীমান্ত থেকে এনে নিরাপদ স্থান খুঁজে না পেয়ে খালে ফেলে দিয়েছে। তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছিলেন, ‘এটি কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়। যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া ভন্ডুল করতে চায়, এটা তাদের কাজ।’

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ‘হুমকি’ এ অস্ত্রের বিষয়টি নিয়ে এখন আর পুলিশের তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এই অস্ত্র কাদের, কোথা থেকে এল, অস্ত্র আনার উদ্দেশ্য কী, কোনো কিছুই জানতে পারেনি। বলা যায়, ঘটনার পর গত পাঁচ বছরে পুলিশের তদন্তের ফলাফল ‘শূন্য’।

২০১৬ সালের জুনে তিন দফায় বিপুল পরিমাণ পিস্তল, এসএমজি, গুলি ও গোলাবারুদ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারের পর তুরাগ থানায় তিনটি পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। ওই তিন জিডি ধরেই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ তদন্ত শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় পাঁচ বছর তদন্ত করে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি সিটিটিসি। এ অবস্থায় নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল অকেজো।

অনেক সময় সঠিক লিংক না পেলে রহস্য উদ্‌ঘাটন করা যায় না। দুনিয়ার অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের পুলিশও সব সময় সবকিছু উদ্‌ঘাটন করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে তা বিশেষায়িত সংস্থায় স্থানান্তর করা হয়।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ

পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ১৮ জুন প্রথম দফায় উত্তরার ১৬ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ী খাল থেকে সাতটি কালো ব্যাগের ভেতর থেকে ৯৫টি ৭.৬২ এমএম পিস্তল, ২টি ৯ এমএম পিস্তল, ৪৬২টি ম্যাগাজিন (২৬৩টি এসএমজি), ১ হাজার ৬০টি গুলি, ১০টি বেয়নেট, ১৮০টি ক্লিনিং রড ও ১০৪টি স্প্রিং যুক্ত বাক্স উদ্ধার করা হয়। ১৯ জুন ওই খাল থেকে আরও তিনটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে ছিল এসএমজির ৩২টি ম্যাগাজিন ও ৮টি ক্লিনিং রড। ২৫ জুন একই এলাকার অন্য একটি খাল থেকে উদ্ধার করা হয় আরও তিনটি ব্যাগ। তাতে ৫টি ওয়াকিটকি, ২টি ট্রান্সমিটার, ২টি ফিডার কেব্‌ল, ২২টি কৌটা (যার মধ্যে ছিল আইসি, ট্রানজিস্টর, ক্যাপাসিটর ও সার্কিট), ৭ প্যাকেট বিস্ফোরক জেল, ৪০টি পলিথিনের ব্যাগে থাকা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, ৩২৫টি রুপালি ও সবুজ রঙের স্প্রিংযুক্ত বাক্স ছিল। এ ছাড়া আরও কিছু বৈদ্যুতিক ডিভাইসও উদ্ধার করা হয়।

তিন জিডি তদন্ত তদারকের সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার আহমেদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা যায়নি। কিছুদিন আগে সিআইডি জিডিগুলোর তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে।

জিডিগুলোর তদন্ত তদারক কর্মকর্তা স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ত্র ও গুলিগুলো কারা রেখেছিল, তা এখনো জানা যায়নি।’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় সঠিক লিংক না পেলে রহস্য উদ্‌ঘাটন করা যায় না। দুনিয়ার অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের পুলিশও সব সময় সবকিছু উদ্‌ঘাটন করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে তা বিশেষায়িত সংস্থায় স্থানান্তর করা হয়।

এই অস্ত্র উদ্ধারের ১২ দিন পর রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। তদন্তের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, জঙ্গিরা ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতার জন্য এই অস্ত্র এনেছে। কিন্তু হোলি আর্টিজানসহ কয়েকটি জঙ্গি হামলায় যে ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, দিয়াবাড়ীর খাল থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, দিয়াবাড়ী থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর সঙ্গে জঙ্গিদের বা গুলশানে হোটি আর্টিজানে ব্যবহৃত অস্ত্রের মিল নেই। জঙ্গিদের কাছে এ পর্যন্ত যত অস্ত্র পাওয়া গেছে, তার বেশির ভাগই পাশের দেশ ভারত থেকে আনা।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হোলি আর্টিজানে একে ২২ রাইফেল ও ৭.৬৫ পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যদিকে দিয়াবাড়ী থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো দেশের ভেতরে তৈরি।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন