রাজধানীর দারুসসালাম থানার দক্ষিণ বিশিলে রাস্তায় বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে গত ১১ জানুয়ারি সৌদিপ্রবাসী বাদল খানকে আটক করেন ওই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মশিউর রহমান। বাদল প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, আটকের পর এসআই মশিউর তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ইয়াবা এবং মানি লন্ডারিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখান। পরে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেখানে থাকা আড়াই হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন।
এসআই মশিউর প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও গতকাল রাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি এ বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রস্তুত আছেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে আটক করে টাকা আদায় এবং হয়রানির অভিযোগ পুরোনো। তবে ২০-দলীয় জোটের অবরোধ শুরুর পর আটক-বাণিজ্যের পাশাপাশি হয়রানির অভিযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজধানীর নয়টি থানা এলাকা থেকে পাওয়া অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে এর সত্যতা মেলে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন বিভিন্ন থানায় গিয়ে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিনা কারণে তাঁদের রাস্তা থেকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কাউকে কাউকে বলা হচ্ছে বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের কর্মী। হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। যাঁরা চাহিদামতো টাকা দিতে পারছেন না তাঁদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতে জামিন না পেলে যেতে হচ্ছে কারাগারে। দাবিমতো টাকা না পেয়ে আটক এক যুবককে হত্যার অভিযোগও উঠেছে পল্লবী থানার তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী অনেকে হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি।
গত ৬ জানুয়ারি অবরোধ শুরুর পর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪২। এঁদের একটি অংশ এই আটক-বাণিজ্যের শিকার বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে আটক-বাণিজ্য ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তিনি পাননি। ঢালাও অভিযোগ তিনি মানতে চান না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ঘটনাস্থল, তারিখ-সময় ও অভিযুক্ত পুলিশের নাম উল্লেখ করে তাঁর কাছে অভিযোগ করতে বলেন তিনি। তিনি জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএসএম শাহজাহান প্রথম আলোকে জানান, যখন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কর্মকর্তাদের উচিত পুলিশ প্রবিধান অনুসারে যেভাবে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, সেটা কড়াকড়ি করা এবং কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো।
কয়েকটি ঘটনা: ৫ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা থেকে এক ব্যবসায়ীকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁর পরিবার ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে নির্দোষ দাবি করে ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানায়। ডিবির এক কর্মকর্তা ছাড়ার জন্য দুই লাখ টাকা দাবি করে বলেন, টাকা না দিলে নাশকতার মামলায় দেওয়া হবে। নিরুপায় হয়ে পরিবারটি একজনের মাধ্যমে ঘটনাটি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। ওই কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে টাকা দেওয়া থেকে বাঁচলেও ওই ব্যক্তি ছাড়া পাননি। দুই দিন আটক রাখার পর তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁর এক স্বজন বলেন, ‘আমরা ২০ হাজার টাকা দিতেও রাজি হয়েছিলাম।’
৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টায় বনশ্রীতে দুই যুবককে আটক করে খিলগাঁও থানার পুলিশ। তাঁদের পরিচিত সংবাদকর্মী মাহফুজুল্লাহ তখন পুলিশকে বলেন, ‘এঁরা ভালো ছেলে।’ এতে পুলিশ তাঁকেও গাড়িতে তোলে। পুলিশের এক সোর্স (তথ্যদাতা) মাহফুজুল্লাহকে জানান, ২০ হাজার টাকা না দিলে তাঁদের পেট্রলবোমাসহ আটক দেখানো হবে। সারা রাত তাঁদের গাড়িতে নিয়ে টহল দিয়ে ভোরে নেওয়া হয় থানায়। সোর্স থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে জানান, পেট্রলবোমাসহ তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তাকে মাহফুজুল্লাহ তাঁর পরিচয় দেন ও ঘটনা জানান। এরপর ওই কর্মকর্তা সোর্সকে থাপড় দিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেন।
পরে মাহফুজুল্লাহ ঘটনাটি প্রথম আলোকে জানান। ওই রাতে সেখানে দায়িত্বে থাকা খিলগাঁও থানার এসআই আবু জাফর হাওলাদার জানান, আসলে পুরস্কার ঘোষণার পর সোর্সরা বিভিন্ন ভুল তথ্য দিচ্ছেন। ওই তিনজন নির্দোষ হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থানার মণিপুরে সমাজকল্যাণ কমপ্লেক্সের পাঁচটি ভবনে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরা কারাগারে আছেন। তাঁদের একজন শেওড়াপাড়ায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তাঁর বিষয়ে খোঁজ নিতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয় ওই থানার সামনে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, ওই কর্মচারী নিরীহ, রাজনীতি করেন না।
৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ চারজন চালককে আটক করে ডিবি। তাঁদের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ছেড়ে দিতে প্রত্যেকের কাছে ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন এক কর্মকর্তা। দর-কষাকষির পর ২০ হাজার টাকায় রফা হয়। পরে ডিবির কনস্টেবল নজরুলকে টাকা নিয়ে একটি অটোরিকশা ছাড়া হলেও তিনটি আটকে রাখা হয়। চারজন চালককে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবারও হয়রানির আশঙ্কায় চালকেরা নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
যোগাযোগ করা হলে কনস্টেবল নজরুল প্রথম আলোকে জানান, এটা ভুল হয়ে গেছে। টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রায়েরবাগ থেকে হাবিবুর রহমান নামের একজনকে আটক করে কদমতলী থানার পুলিশ। স্বজনেরা জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখালে তাঁরা ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে পুলিশ তাঁকে ডিএমপি আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। পরদিন তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৪ ফেব্রুয়ারি একই থানার পুলিশ কদমতলী থেকে তিনজনকে আটক করে। তাঁদেরও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ডিএমপি আইনে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরাও জামিন পেয়েছেন।
৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার কুতুবখালীতে ছাত্র পড়িয়ে ফেরার পথে আটক হন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা এক যুবক। তাঁকে পেট্রলবোমা হামলা মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩৫ হাজার টাকা নেন এসআই মোক্তার। তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি জামিন পান। অবশ্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই মোক্তার জানান, জনতা ওই যুবককে ধরে পুলিশে দিয়েছিল।
৭ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ তালতলা থেকে এক কলেজছাত্রকে আটক করে। তাঁকে ছাড়াতে মা ও বড় ভাই থানায় গেলে ভাইকেও আটক করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা এবং পরে মিরপুর থানার পুলিশ রিমান্ডে নেয়। বৃহস্পতিবার মিরপুর থানার সামনে তাঁদের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর ছেলেরা রাজনীতি করেন না। গ্রেপ্তারের খবরে তাঁদের বাবা এখন শয্যাশায়ী।
৬ জানুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে স্বামীবাগের মুন্সিরটেক থেকে এক মুদি দোকানিকে আটক করেন গেন্ডারিয়া থানার এসআই শাহজাহান ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সুজন। ওই মুদি দোকানি জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলার ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আধা ঘণ্টা পর রাস্তাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।
দয়াগঞ্জ, মীরহাজিরবাগ ও আশপাশের এলাকা, ধোলাইখালে টহল পুলিশের বিরুদ্ধে পথচলতি মানুষকে হয়রানির অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনের। সন্ধ্যার পর এই হয়রানি বাড়ে।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, এমন দু-একটি ঘটনা ঘটলেও তা পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যাঁদের আটক করা হয়, যাচাই শেষে তাঁদের কাউকে কাউকে ছেড়েও দেওয়া হয়।
কারওয়ান বাজারে পথচলতি কিশোর ও যুবকদের তল্লাশির নামে হয়রানি এবং পুলিশের গাড়িতে তোলার দৃশ্য প্রতিদিনের। কখনো কখনো পণ্যবাহী ট্রাক এসে থামলে পুলিশ চালকের পকেটে হাত দিয়ে টাকা নিচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন ট্রাকচালকেরা।
আটকের পর দাবিমতো টাকা না পেয়ে পল্লবী থানার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জি এম নাহিদকে (২২) হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বরাবর তাঁর পরিবারের করা অভিযোগ অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের প্রশিকা ভবনের সামনে থেকে এসআই তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে নাহিদকে তুলে নেয় পুলিশ। পরে পরিবারকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরিবার থানায় গেলে তাঁকে ছাড়তে পুলিশ পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। প্রথমে ২০ হাজার ও পরে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তাঁর লাশ শনাক্ত করে পরিবার।
নাহিদের লাশ বেশ কয়েকটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভাষানটেকের বালুর মাঠ থেকে উদ্ধারের পর পাঁচ দিন শনাক্তহীন অবস্থায় মর্গে পড়ে ছিল।
নাহিদকে পুলিশ আটক করেছে, এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার নিশারুল আরিফ। নাহিদের পরিবার তাঁকে তুলে নেওয়া গাড়ির নম্বরও দিয়েছে। ওই নম্বরের গাড়ি পল্লবী থানার সিভিল টিমের বলে উপকমিশনার জানান।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নূর খান প্রথম আলোকে জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এ ছাড়া থানায় তদন্তাধীন মামলাও থাকে। ফলে দেখা যায়, গ্রেপ্তার অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষ যখন ধরা পড়েন তখন তাঁদের ওসব মামলায় ফাঁসানো হয়। অথবা টাকায় রফা হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ শারীরিক-মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আটক ও হয়রানির পাশাপাশি রাজধানীতে আবার শুরু হয়েছে ডিবি কিংবা পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই। ৪ ফেব্রুয়ারি আসাদগেটে একটি ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা তোলেন এজাজ আহমেদ। সঙ্গে তাঁর অফিসের এক কর্মচারী ছিলেন। টাকা নিয়ে কিছুদূর যেতেই ‘ডিবি’ লেখা কাগজ সাঁটানো একটি মাইক্রোবাসে থাকা কয়েকজন যুবক নিজেদের ডিবি পরিচয় দিয়ে তাঁদের মাইক্রোবাসে তোলে। ‘ক্রসফায়ারের’ ভয় দেখিয়ে ও মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের নামিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী এজাজ এ ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন