default-image

যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টের (জিসিএম বা সাবেক এশিয়া এনার্জি) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এখন কোনো চুক্তি নেই। এরপরও দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন এবং তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে—এমন দাবি করে যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) শেয়ার ব্যবসা করছে কোম্পানিটি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, চুক্তি না থাকার পরও ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করবে—এমন অসত্য তথ্য দিয়ে লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে জিসিএম বা এশিয়া এনার্জি। বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথে এগোচ্ছে সরকার।

নসরুল হামিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে, ফুলবাড়ী থেকে এখন কয়লা উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। ফুলবাড়ীর কয়লা ভবিষ্যতের জন্য মজুত রেখে দেওয়া হয়েছে। যদি ভবিষ্যতে উন্নত কোনো প্রযুক্তি আসে, যার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি হবে না, তখন কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে ভাবা যাবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে একটি সমীক্ষা ও কর্মপরিকল্পনার (কয়লা উত্তোলন) জন্য ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি জ্বালানি বিভাগের প্রতিষ্ঠান খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) কাছ থেকে দুই বছরের অনুমোদন (লাইসেন্স) পায় এশিয়া এনার্জি। ওই অনুমোদনের মেয়াদ ২০০৬ সালের ২৭ জানুয়ারি শেষ হয়ে গেছে। এরপর এশিয়া এনার্জির লাইসেন্স আর নবায়ন করেনি বিএমডি। তাই আইনত ফুলবাড়ী কয়লাখনির উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই কোম্পানির।

২০০৪ সালে অনুমোদন পাওয়ার পর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা করে এশিয়া এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটিকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ৯২ শতাংশ মালিকানা দিয়ে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল বলে জানান জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।

 উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ও কয়লা রপ্তানির বিরোধিতা করে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি তখন এশিয়া এনার্জির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে খনি এলাকায় সমাবেশ ডাকা হয়। সমাবেশে তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) গুলিতে স্থানীয় তিন ব্যক্তি নিহত হন, আহত হন দুই শতাধিক। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার তেল-গ্যাস কমিটির সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার ও তাদের বিচার, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা।

বাংলাদেশে সম্পদ দেখিয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যবসা

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান,লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সহযোগী হিসেবে কাজ করা অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) ২০০৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় এশিয়া এনার্জি। অবশ্য তখন কোম্পানির নাম পাল্টে রাখা হয় জিসিএম। ভবিষ্যতে সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ধরনের ব্যবসার জন্য বিভিন্ন কোম্পানিকে শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহের সুযোগ করে দেয় এআইএম।

কিন্তু ২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের সঙ্গে এশিয়া এনার্জির কোনো চুক্তি না থাকার পরও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটি তার সম্পদের মধ্যে ফুলবাড়ী কয়লাখনির তথ্য তুলে ধরছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি ফুলবাড়ী কয়লাখনির মুখে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সঙ্গে চুক্তি সই করেছে এশিয়া এনার্জি। কয়েক বছর ধরে লন্ডনের শেয়ারবাজারে এশিয়া এনার্জির শেয়ারের মূল্য নিম্নমুখী ছিল। চীনের কোম্পানির চুক্তি সইয়ের পর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৭৫ পেন্স (১০০ পেন্সে ১ ব্রিটিশ পাউন্ড)।

ফুলবাড়ী কয়লাখনির মুখে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এশিয়া এনার্জির চুক্তির বিষয়ে কিছু জানে না বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

এশিয়া এনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো চুক্তি না থাকার পরও কীভাবে তারা ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করবে—এমন দাবি করছে, তা জানতে কোম্পানির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট মাহমুদ হাফিজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কথা বলার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নই।’

এদিকে পরিবেশবাদী ও অধিকারভিত্তিক ১২টি সংগঠন গত ১৯ জুলাই লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ডেভিড পি ওয়ারেনকে চিঠি দিয়ে জিসিএমের শেয়ার ব্যবসা বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। একই দাবিতে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন পরিবেশবাদী ১২টি সংগঠনের কর্মীরা। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ফুলবাড়ী সলিডারিটি গ্রুপ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির যুক্তরাজ্য শাখা, যুক্তরাজ্যের এক্সটিংশন রিবেলিয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানগ্রোভ অ্যাকশন ফরেস্ট, ব্যাংক ট্রাকসহ ১২টি সংগঠন।

সার্বিক বিষয়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রকাশ্যে চীনা কোম্পানির সঙ্গে এশিয়া এনার্জি খনি এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করছে, অথচ সরকার জানে না, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই কোম্পানির বেআইনি তৎপরতা বন্ধ করা দরকার। আসলে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী এশিয়া এনার্জির কাছ থেকে অর্থ পায়, যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0