চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পাহাড়ে একটি ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ খুঁজে পেয়েছে বলে দাবি করেছে র্যাব। গত শনিবার বিকেল থেকে গতকাল রোববার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার এবং মাটির নিচে পুঁতে রাখা অস্ত্র-গুলি ও প্রশিক্ষণসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলেও র্যাব জানিয়েছে।
কিন্তু এটা কোন জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা কোন সংগঠনের সদস্য, সেটা জানাতে পারেননি র্যাবের কর্মকর্তারা।
বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব সাধনপুর ইউনিয়নের লটমণি পাহাড়ি এলাকায় কথিত জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গতকাল দুপুরে সংবাদ ব্রিফিং করেন র্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ। তিনি সংবাদ ব্রিফিং করার জন্য ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে এখানে আসেন। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারী সদরের একটি ভবন থেকে ১২ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বাঁশখালীর এই প্রশিক্ষণকেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য পায়। এর ভিত্তিতে র্যাব-৭-এর একটি দল শনিবার বিকেলে এই পাহাড়ি এলাকায় অভিযান শুরু করে। তারা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার মিঠাপুকুরের মোবাশ্বের হোসেন (১৭), গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার আমির হোসেন (২৫), ময়মনসিংহের গাছোয়ারপাড়ার আবদুল খালেক হুরায়রা (২১), টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আমিনুল ইসলাম হামজা (২৫) ও মির্জাপুরের হাবিবুর রহমান (১৯)। সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই পাঁচজনকে হাজির করা হলেও তাঁদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলা হয়, এই পাঁচজনকে আটকের পর তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখা সাতটি প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি একে-২২ রাইফেল, ছয়টি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার, তিনটি এলজি, একে-২২ রাইফেলের ছয়টি ম্যাগাজিন, পিস্তলের নয়টি ম্যাগাজিন, ৭৫১টি গুলি, ছয়টি লম্বা ছুরি, ৩৮টি ট্র্যাকসুট, দুটি ওয়াকিটকি, ১৪ জোড়া প্রশিক্ষণের জুতা, মোটা রশি, দুটি বক্সিং গ্লাভস।
ব্রিফিং শেষে চট্টগ্রাম অঞ্চলের র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমদ সংবাদিকদের অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রীভর্তি ড্রামগুলো পুঁতে রাখার স্থান দেখান। কিন্তু গর্তগুলো দেখতে নতুন করে খোঁড়া বলে মনে হওয়ায় সাংবাদিকেরা কারণ জানতে চান। জবাবে মিফতাহ উদ্দিন বলেন, এখানকার পাহাড়ি মাটি ঝরঝরে। তাই গর্তগুলো তাজা মনে হচ্ছে।
দুই পাহাড়ের মাঝখানে খালি জায়গায় কথিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রটিতে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার রয়েছে। এর এক পাশে টিন দিয়ে ঘেরা ছোট একটি ঘর। অপর পাশে গরু, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। ছোট্ট একটা পুকুর খননের পর্যায়ে আছে। তবে খামারের
কোনো কর্মীকে দেখা যায়নি। র্যাবের দাবি, টের পেয়ে অভিযানের আগেই কর্মচারীরা পালিয়ে গেছেন।
ব্রিফিংয়ে কমান্ডার মুফতি মাহমুদ বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে বাঁশখালীর মাওলানা মোবারক ও চকরিয়ার আজিজ উদ্দিন এই খামার তৈরি করেছেন। তাঁদের ধরতে পারলে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি বলেন, তাঁরা ধারণা করছেন, এখানে বিমান ছিনতাইয়ের কৌশল, গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ও আইএসের ভিডিওচিত্র দেখে জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিত।
আর র্যাব-৭-এর অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন বলেন, এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে জঙ্গিরা দিনের বেলায় খামারের শ্রমিক সেজে কাজ করত, রাতের বেলায় প্রশিক্ষণ নিত। তারা গাছের সঙ্গে রশি পেঁচিয়ে, টার্গেট বোর্ড লাগিয়েও প্রশিক্ষণ নিত।
জঙ্গিদের এই আস্তানা সম্পর্কে এত তথ্য দেওয়া হলেও এটা কোন সংগঠনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল বা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা কোন সংগঠনের সদস্য, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি র্যাবের কর্মকর্তারা। সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুফতি মাহমুদ বলেন, আটক পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।
অবশ্য এর আগে গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারী থেকে যে ১২ জন জঙ্গিকে আটক করে এ জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সন্ধান পেয়েছে বলে র্যাব দাবি করছে, ওই ১২ জনের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ও জানানো হয়নি। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে এখন পর্যন্ত রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনও করা হয়নি।
কথিত এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের আশপাশে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বসতি নাই। গতকাল র্যাব ও গণমাধ্যমের কর্মীদের আসার খবর পেয়ে আশপাশের কয়েক শ মানুষ সেখানে জড়ো হন। তাঁদের একজন মো. ফোরকান বলেন, হাতির আক্রমণের ভয়ে এখানে সাধারণ লোকজন আসত না। তবে মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ শুনতে পেতেন। তাঁরা জানতেন, হাতি তাড়ানোর জন্য গুলি করা হতো।
সাহেবহাট এলাকার আবদুল আলীম জানালেন, পাহাড়ে ওই খামারটি করেছেন মাওলানা মোবারক। সাহেবহাটের পাশে তাঁর বাড়ি। তিনি একসময় মসজিদে ইমামতি ও বিমা কোম্পানিতে কাজ করতেন। কয়েক দিন ধরে মাওলানা মোবারক ও তাঁর পরিবারের কাউকে বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না।
তবে বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার ছমির উদ্দিন দাবি করেন, দুই বছর ধরে এখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এত দিন বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন জানাননি—এ কথা জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন