বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গাড়িচালক আমানউল্লাহ ভূঁইয়া, ব্যবসায়ী আবু তালেবসহ গ্রেপ্তার পাঁচজন ইতিমধ্যে ঢাকার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় হওয়া দুটি মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান প্রথম আলাকে বলেন, পাকিস্তানের করাচিতে বসে স্থানীয় চক্রের প্রধান ফজলুর রহমান ওরফে ফরিদ বাংলাদেশে ভারতীয় জাল মুদ্রার কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। চক্রের সদস্যরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে জাল রুপির বড় একটি অংশ পাচার করেন। আর বাকি অংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত এবং শিবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ফেনসিডিল, অস্ত্র, চোরাই মুঠোফোন, গাঁজাসহ বিভিন্ন অবৈধ সামগ্রী বেচাকেনায় ব্যবহার করেন।

মশিউর রহমান জানান, গত বছর নভেম্বরে ৭ কোটি ৩৫ লাখ জাল রুপি উদ্ধারের ঘটনায় রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় মামলা হয়। এর সূত্র ধরে গত ৭ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড এলাকা থেকে নোমানুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই নোমানুর করাচিতে অবস্থানরত ফজলুর রহমানের ভাই। জিজ্ঞাসাবাদে নোমানুর স্বীকার করেন, তাঁর ভাই বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান থেকে সমুদ্রপথে মোজাইক পাথর, শুঁটকি ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর বস্তার মধ্যে ভারতীয় জাল মুদ্রা বাংলাদেশে পাঠান। এরপর জাল রুপির একটি চালানের একাংশসহ তাঁদের আরেক ভাই সাইদুর রহমান, ব্যবসায়ী আবু তালেব ও ফাতেমা আক্তার নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা থেকে হুন্ডি ব্যবসায়ী শাজাহানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

default-image

এই চালানের বাকি জাল রুপি আমানউল্লাহ ভূঁইয়া–কাজল রেখা দম্পতির হাজারীবাগের মনেশ্বর রোডে বাড়ির নিচতলায় রাখা হয়। সেখানে অভিযান চালিয়ে আমানউল্লাহ ও তাঁর শ্যালক ইয়াসির আরাফাত ওরফে কেরামতকে আটক করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ১২ লাখ ভারতীয় জাল মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। আমানউল্লাহ ভূঁইয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা শাখার গাড়িচালক। পরে আবার ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ জাল রুপিসহ কাজল রেখাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউরের দেওয়া তথ্যমতে, কাজল রেখার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বেনীচক গ্রামে। স্বামী আমানউল্লাহ ছাড়াও তাঁর ভাই ইয়াসিন আরাফাত, বোন শারমিন দোয়েল, ভগ্নিপতি সোনামিয়া, চাচা আয়নাল হোসেন, ভাগনে ফিরোজ, কিবরিয়া ও ভাতিজা নেলসন জাল রুপি চোরাচালানে জড়িত। এই চক্রের সদস্যরা প্রথম দিকে বিমানযাত্রী সেজে লাগেজে করে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জাল রুপি ঢাকায় আনতেন। পরে সেগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পাচার করতেন।

default-image

আর পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থানরত চক্রের হোতা ফজলুর রহমানের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে। তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য একসময় পাকিস্তানে থাকতেন। সেখান থেকেই ফজলুর বাংলাদেশে ভারতীয় জাল রুপির কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দল এই কাজে জড়িত। দেশে এই কারবারে ফজলুরকে সহযোগিতা করেন ভাই সাইদুর রহমান, নোমানুর রহমান ও ভগ্নিপতি শফিকুর রহমান।

মামলার তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গত ছয় বছরে ডিবি ভারতীয় জাল মুদ্রাসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এঁদের অন্তত ছয়জন পাকিস্তানি। জাল রুপি পাচার চক্রের সদস্যরা অবৈধ উপায়ে ব্যাংক ও হুন্ডির মাধ্যমে পুরো লেনদেন করতেন। গত এক বছরে চক্রটি দেশের তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬৭৯ টাকা লেনদেন করেছে।

default-image

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের গেন্ডারিয়া শাখার একটি অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৫১ টাকা লেনদেন করেছে চক্রটি। অপর দিকে ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি অ্যাকাউন্টে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ২৫ লাখ ৪০ হাজার ৯৬২ টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ইসলামপুর শাখার অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেন হয়েছে ২১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৩৬ টাকা।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, এক যুগ ধরে পাকিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ভারতীয় জাল রুপির কারবার। এ কাজে জড়িত চক্র জাল রুপি খালাস করে গুদামে মজুত, ডিলারদের মধ্যে সরবরাহ করা এবং বিক্রি করা জাল মুদ্রার অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন। পরে তা হুন্ডি করে পাকিস্তানে ফজলুর রহমানের কাছে পাচার করতেন। চক্রের সদস্যরা ১ লাখ ভারতীয় জাল মুদ্রা ৩৮ হাজার টাকায় কিনে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকায় বিক্রি করে আসছিলেন। প্রতি লাখ ভারতীয় জাল মুদ্রা বিক্রি করে চক্রের সদস্যরা পেতেন তিন থেকে চার হাজার টাকা করে।

পাকিস্তান থেকে যেভাবে জাল মুদ্রা দেশে আসে

ডিবির তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ফজলুর রহমান পাকিস্তানের অপরাধীদের সঙ্গে মিলে ভারতীয় জাল রুপির কারবার করেন। করাচিতে বসবাসরত বাংলাদেশের নাগরিক শফি ও তাঁর ছেলে সুলতান ভারতীয় জাল রুপি তৈরি করেন। আবার অন্যের কাছ থেকেও জাল রুপি সংগ্রহ করেন তাঁরা। পরে সেগুলো পাকিস্তান থেকে ফজলুর রহমানের মাধ্যমে করাচি বন্দর থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিকে ফজলুর রহমান পাকিস্তানে থ্রিপিস ও খেলাধুলার সামগ্রীর ভেতর ভারতীয় জাল রুপি দেশে পাঠাতেন। পরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শুঁটকি, মোজাইক ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর বস্তার মধ্যে নৌপথে জাল রুপি বাংলাদেশে পাঠানো শুরু করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পৌঁছানোর পর ব্যবসায়ী আবু তালেব সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, সিকিউরিটি চেক পার করিয়ে কনটেইনারে থাকা জাল রুপি খালাস করেন। সেগুলো ঢাকায় এনে ডেমরার একটি গুদামে রাখা হতো। পরে আবু তালেব ও আমানউল্লাহ তাদের চক্রের সদস্য মোস্তফা, হাবিল, আয়নাল, মাসুদ, নেলসন, একরাম ও ইয়াদুরদের দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও শিবগঞ্জ সীমান্ত পার করে দিতেন।

পাঁচজনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধারের ঘটনায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার পাঁচজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন ব্যবসায়ী আবু তালেব, আমানউল্লাহ ভূঁইয়া, তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা, শ্যালক ইয়াসিন আরাফাত এবং চক্রের সদস্য ফাতেমা আক্তার।

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আবু তালেব বলেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী। ২০১৪ সালে পাকিস্তানে বসবাসরত ফজলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এর দু-তিন বছর পর ব্যবসায়িক কাজে তিনি পাকিস্তানে যান। সেখানে ফজলুর সঙ্গে দেখা হলে তাঁদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ফজলুর রহমান তাঁকে পাকিস্তানের নাগরিক সুলতানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একপর্যায়ে তিনি ফজলুর সঙ্গে ভারতীয় জাল রুপি কারবারে যুক্ত হন। তিন মাস আগে ফজলুর রহমান পাকিস্তান থেকে ৫৪০ বস্তা পাথরের মধ্যে ৯৫ বস্তা জাল রুপি পাঠান। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ওই জাল রুপি তিনি গ্রহণ করেন। পরে চক্রের সদস্য ফাতেমা আক্তারের কাছে জাল রুপিগুলো রাখতে দেন। এই কাজের জন্য কমিশন হিসেবে আবু তালেবের ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। এর আগেই ফাতেমা ডিবি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

অপর একটি চক্রের প্রধান আমান উল্লাহ ভূঁইয়া আদালতকে বলেন, ২০১৪ সালে তিনি ভারতীয় জাল রুপির কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ২০২০ সালে পাকিস্তান থেকে ৫০ লাখ জাল রুপির চালান পৌঁছালে তিনি তা গ্রহণ করেন। গত বছর অক্টোবরে পাকিস্তান থেকে আড়াই কোটি জাল রুপির চালান আসে। ফজলুর রহমানের দেওয়া একটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে ওই জাল রুপি বিক্রি করে দিতেন তিনি। সেসব জাল রুপি বিক্রির টাকা ফজলুর রহমানের ভাই সাইদুর বিভিন্ন ব্যাংকে জমা দিতেন।

জবানবন্দিতে ফাতেমা আক্তার আদালতকে বলেন, তাঁর স্বামী দানিশ পাকিস্তানের নাগরিক। ২০০৭ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দানিশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং পরে বিয়ে হয়। এরপর মাঝেমধ্যেই ফাতেমা পাকিস্তানে দানিশের কাছে যান। পাকিস্তানের নাগরিক সুলতানের মাধ্যমে জাল রুপি কারবারে যুক্ত হন তিনি। সুলতানের পরামর্শে গত বছর চক্রের সদস্য শরফুদ্দিনের কাছে ২০ কার্টন জাল রুপি বেচে তিনি ১৮ লাখ টাকা পান। সেই টাকা চক্রের সদস্য কামাল ওরফে শাহজাহানের হাতে তুলে দেন। গত বছরের ২১ নভেম্বর কাওলা রেলগেটে তাঁর বাসার নিচে একটি কাভার্ড ভ্যানে মোজাইক পাথরের ভেতর থাকা জাল রুপি চক্রের সদস্য গোলাম মোস্তফা ও আবুল বাশারের কাছে রাখতে দেন। এ সময় চক্রের সদস্য মোস্তফা, বাশার, সাইদুর রহমান ও শরফুদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। দুদিন পর জাল রুপিভর্তি ট্রাক ভাড়া করে চক্রের হোতা আবু তালেবের কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি। এ জন্য সুলতান তাঁকে তিন লাখ টাকা দেন।

ফাতেমা বলেন, গ্যারেজ থেকে জাল রুপি ট্রাকে করে পাঠিয়ে দিলেও আরও কিছু জাল রুপি থেকে যায় তাঁর গ্যারেজে। দুদিন পর ডিবি পুলিশ তাঁর বাড়ির গ্যারেজ ভেঙে ৭ কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করে।

চক্রের অপর সদস্য ইয়াসিন আরাফাত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, পুরান ঢাকার বাদামতলী চায়না মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান তাঁর পূর্বপরিচিত। সাইদুর তাঁকে লাগেজভর্তি জাল রুপি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও কানসাটের আয়নাল ওরফে আইনালের কাছে পাঠাতেন। এ জন্য প্রতিবার ১০ হাজার টাকা পেতেন ইয়াসির। তিনি মহাখালী ও হাজারীবাগ থেকে জাল রুপিভর্তি লাগেজ নিতেন। সেগুলো আইনালের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়ে পুরান ঢাকার ইসলামী ব্যাংকের ওয়াইজঘাট শাখায় সাইদুরের ব্যাংক হিসেবে জমা দিতেন।
জবানবন্দিতে কাজল রেখা বলেন, তাঁর স্বামী আমানউল্লাহর জাল রুপির কারবার। আমানউল্লাহর মাধ্যমে আরেক জাল রুপির কারবারি সেলিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ২০০৯ সালে সেলিম তাঁর ছোট ভাই ইয়াসিন আরাফাতকে দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় জাল রুপি পাঠাতেন। এরপর তিনিও ঢাকা থেকে বেশ কয়েকবার জাল রুপি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মনাকশার এয়াদুর ও তাঁর ভাগনের কাছে পৌঁছে দিতেন। প্রতিবার ৮-১০ লাখ ভারতীয় জাল রুপি বহনের জন্য তিনি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে পেতেন।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন