ভারত সীমান্ত দিয়েও আসছে ইয়াবা!

ভারত সীমান্ত দিয়েও নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ইয়াবা বড়ি পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসছে বলে প্রমাণ পেয়েছে সরকারের সংস্থাগুলো। তবে এই ইয়াবা ভারতে তৈরি হচ্ছে, নাকি পাচারকারীরা ভারতের সীমান্তকে নতুন রুট হিসেবে ব্যবহার করছে, তা নিশ্চিত নয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২০১২ সাল থেকে ইয়াবা এবং কয়েকটি নতুন ধরনের মাদক আসার বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর আগে এসব সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা ও মদ পাচার হয়ে আসত। ইয়াবা আসার বিষয়টি ভারতের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকেও জানানো হয়েছে। দুই দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আগামী বৈঠকে বাংলাদেশ এ বিষয়টি ভারতের কাছে তুলে ধরবে।
দেশে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মতে, থাইল্যান্ড থেকে সমুদ্রপথেও কিছু ইয়াবা আসে। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভারতের তুলনায় অনেক কম। তাই ভারত থেকে ইয়াবা এলে এই মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে মাদকের বাজার প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ইয়াবার বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। গত ছয় বছরে দেশে ইয়াবা আটকের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭৭ গুণ। আটকের তুলনায় ইয়াবার ব্যবহার অনেক বেশি। তাই কেবল মিয়ানমার দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা আনা মাদক চোরাকারবারিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্যই চোরাকারবারিরা ভারত ভূখণ্ড ও সীমান্তকে নতুন রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা।
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো জানায়, গত দুই বছরে ইয়াবা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নতুন ধরনের মাদক বুপ্রিনরফিন (ইনজেকশনের মাধ্যমে নিতে হয়) এবং ফেনসিডিলজাতীয় কোডিল্যাব, নেলকো, কোডোকফ, প্রোভোকফ, আইকন-এক্সপি নামের তরল মাদক দেশে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, ২০১২ সালে নয়াদিল্লিতে দুই দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সে দেশের সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসার সন্দেহের বিষয়টি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশের সন্দেহ, ভারত সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা হয়তো ভারতে তৈরি হচ্ছে অথবা পাচারকারীরা দেশটিকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। ওই বৈঠকের পর ভারত সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসার বিষয়ে আরও কিছু তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশের সংস্থাগুলো। আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে আরও জোর দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এই ইয়াবাগুলো ভারতে তৈরি হচ্ছে কি না, সেটা আমাদের পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, কোথায় তৈরি হয়েছে সে তথ্য ইয়াবার সঙ্গে থাকে না। তবে ভারত থেকে যে ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে, এর সপক্ষে তথ্য আছে।’
গত ৩০ অক্টোবর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার সাহাপুর থেকে এক লাখ ২০ হাজার এবং ১১ নভেম্বর সুয়াগাজী থেকে এক লাখ ৪৪ হাজারটি ইয়াবা উদ্ধার করে। এসব ইয়াবা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা থেকে আনা হয়েছে বলে বিজিবি ও তদন্তকারীরা প্রমাণ পেয়েছেন। একইভাবে আসাম থেকে আসা ইয়াবার কয়েকটি চালানও বিভিন্ন সংস্থা আটক করেছে। এসব ইয়াবার উৎপাদনস্থল নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে সংস্থাগুলো।
এ ছাড়া রাজশাহী ও যশোর সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবার কয়েকটি চালানও আটক হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বেশি চিন্তিত রাজশাহী ও যশোর সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসা নিয়ে। মূলত এ দুই সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা আটকের পরই এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ইয়াবা কেবল মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে আসে, অধিদপ্তরের এমন ধারণাও ভাঙতে শুরু করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবির গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি স্থানে দুই দেশের (মিয়ানমার ও ভারত) সীমান্ত এসে মিশেছে। এটি অনেকটা ‘নো ম্যানস ল্যান্ডের’ মতো। এই স্থানটিকে ইয়াবা তৈরির বড় ক্ষেত্র বলে মনে করা হয়। প্রথমে অধিদপ্তরের ধারণা ছিল, এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবাই ভারতের মিজোরাম হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। ত্রিপুরা ও আসাম হয়ে আসা ইয়াবাকে ওই ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ তৈরি বলে ধরে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। কিন্তু রাজশাহী ও যশোর সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা ধরা পড়ার পর এই ধারণা ভেঙে যায়। কারণ ওই ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ তৈরি ইয়াবা বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে ঢোকার কারণ নেই। কেননা, এতে চোরাকারবারিদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে বলে এটি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি ব্যয়বহুল। তাই বাংলাদেশের সন্দেহ, পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের কোথাও হয়তো ইয়াবা তৈরি হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু তালেব বলেন, ইয়াবা তৈরির প্রধান কাঁচামাল অ্যামফিটামিন, মেটাফিটামিন ও সিউডোফিড্রিন ভারতের বাজারে সহজলভ্য। এগুলো দিয়ে মূলত সর্দি, কাশি ও নাক বন্ধ উপশমের ওষুধ তৈরি করা হয়। বিশ্বে এই রাসায়নিকগুলোর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত। সবচেয়ে বড় বাজার চীন। ভারতে এই রাসায়নিকগুলো কিনতে ক্রেতাকে ঝামেলা পোহাতে হয় না। আর ইয়াবা তৈরির জন্য বড় কারখানারও প্রয়োজন হয় না।
আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, ভারতকে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানানো হবে। এর আগে বাংলাদেশের দাবির কারণে দেশটি ফেনসিডিল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে। ভারত ফেনসিডিল তৈরির কাঁচামাল কোডাইন আমদানি ৫০ টন থেকে কমিয়ে ৩০ টনে নামিয়ে এনেছে। সীমান্তে ফেনসিডিল তৈরির অনেক কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইয়াবা তৈরির জন্য যেসব কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়, তা বাংলাদেশেও আসে। তবে এগুলো দিয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়। এই কাঁচামাল বছরে সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার কেজি আনার নিয়ম রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি বছরে ২২ থেকে ২৫ হাজার কেজি আমদানি হচ্ছে।