মাগুরায় গতকাল রোববার অবরোধ ও হরতাল-সমর্থকদের ওপর পুলিশের ছোড়া গুলিতে বিএনপির এক নেতা নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন রাতে দিনাজপুরে গ্রেপ্তার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে আহত ছাত্রশিবিরের এক নেতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা গেছেন। 
বিএনপির নেতা নিহত: মাগুরা-যশোর মহাসড়কের মাগুরার শালিখা উপজেলার হাজামবাড়ি মোড় ও আসাদ ডোর মিলের মাঝামাঝি এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন বিএনপির নেতা মশিয়ার রহমান (৫০)। মশিয়ার রহমান শালিখার শতখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
মাগুরার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) সুদর্শন রায় ও শালিখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার নাথ দাবি করেন, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে অবরোধ-সমর্থকেরা সড়কের ওই স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য জড়ো হন। তাঁরা সড়কে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। পরে পুলিশ সেখানে গেলে তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বোমা ও গুলি ছোড়েন। তাঁদের প্রতিহত করতে পুলিশও গুলি চালায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ মশিয়ার রহমানকে উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ চারটি পেট্রলবোমা উদ্ধার করেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুই পক্ষের মধ্যেই গুলিবিনিময় হয়। তাই সে কার গুলিতে নিহত হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ শটগানের পাঁচটি গুলি ছোড়ে।
মাগুরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মমতাজ মজিদ বলেন, মশিউয়ারের ঊরুতে গুলি লেগেছে এবং তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।
তবে পুরোপুরি ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁরা বলেছেন, সন্ধ্যায় বিএনপির নেতা মশিয়ার রহমান ও কর্মী ফারুক হোসেন ছয়ঘরিয়া নতুন বাজারের এক দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। এ সময় পুলিশ বাজারে এলে দুজনই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন পুলিশ তাঁদের ওপর গুলি ছোড়ে। মশিয়ার গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। ফারুক হোসেন পালিয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরও গুলি লেগেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও বলেন, গত শনিবার বিকেলে উপজেলার সীমাখালী বাজার এলাকায় বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করতে জড়ো হলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শালিখা থানার ওসির গাড়ির কাচ ভাঙচুর করেন নেতা-কর্মীরা। ঘটনার পর পুলিশ ওই এলাকায় ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
ছাত্রশিবির নেতা নিহত: দিনাজপুরে শনিবার রাতে গ্রেপ্তার এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ছাত্রশিবিরের নেতা মতিয়ার রহমান (২৭)। ঢাকায় পাঠানোর পর গতকাল হাসপাতালে মারা যান তিনি।
নিহত মতিয়ার রহমান ছাত্রশিবিরের চিরিরবন্দর উপজেলার উত্তর বিভাগের সভাপতি। আর ওই আসামি হলেন উপজেলার নশরৎপুর ইউনিয়নের ভিডিপি কমান্ডার ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খোদা বখ্শ (৪৮)। নিহত মতিয়ার তাঁর ছোট ভাই। শনিবার রাতে রানীরবন্দরে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন খোদা বখ্শ।
পুলিশের ভাষ্য, হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে দিনাজপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের রানীরবন্দর এলাকায় সহিংসতার ঘটনা রোধে কয়েক মাস আগে যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্প বসানো হয়। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা এক অভিযানে রানীরবন্দর বাজারে খোদা বখ্শকে তাঁর ওষুধের দোকান থেকে গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পে নিয়ে যান। নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা একাধিক মামলার আসামি তিনি।
এদিকে খোদা বখ্শকে গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের প্রায় এক হাজার কর্মী-সমর্থক ক্যাম্প ঘিরে ফেলে তাঁর মুক্তির দাবি জানাতে থাকেন। কিন্তু ক্যাম্পের সদস্যদের অনমনীয় অবস্থানের একপর্যায়ে সেখানে থাকা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন তাঁরা। এ ছাড়া ১০-১৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান ও ১৫টির মতো গুলি ছোড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শটগানের ১২২টি গুলি ছোড়ে।
চিরিরবন্দর থানার ওসি মো. আনিছুর রহমান দাবি করেন, এ সংঘর্ষে পুলিশের পাঁচজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ শিবির নেতা মো. মতিয়ার রহমানকে আটক করা হয়।
পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, গুরুতর আহত মতিয়ারকে প্রথমে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে রাতেই তাঁকে ঢাকায় হৃদরোগ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি মারা যান।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মতিয়ারের হাত ও পায়ে গুলি লেগেছে। তাঁর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকায় স্থানান্তর করতে বলা হয়।
বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জামাল হোসেন বলেন, এলাকায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের ঘটনার পর রাতে অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী রানীরবন্দর এলাকা থেকে জামায়াতের কর্মী মো. আবুল কালাম এবং আশাদুল হক নামের শিবিরের এক কর্মীকে আটক করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন