default-image

লাইসেন্স নেই দেশের ২ হাজার ৯১৬টি হাসপাতালের। দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১১ হাজার ৯৪০টি। এর মধ্যে ৯ হাজার ২৪টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে অথবা লাইসেন্সের জন্য আবেদন বা নবায়ন করা হয়েছে। অসংখ্য হাসপাতালকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে অনেক হাসপাতাল কেবল এই দুই সংস্থার ছাড়পত্রের ‘আবেদনের রসিদ’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আবেদনে জমা দিয়েছে। ওই রসিদ বিবেচনায় নিয়েই এবার লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স নিতে আগ্রহী করতে এ প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তারপরও একটা বড়সংখ্যক বেসরকারি হাসপাতাল লাইসেন্সের জন্য বা নবায়নের জন্য আবেদন করেনি। পরিবেশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, এই দুই ছাড়পত্র ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া ঠিক হবে না।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশ ও মাদক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই আবেদন জমার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) মো. ফরিদউদ্দীন মিয়া গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আবেদন প্রক্রিয়া একটু সহজ করার চেষ্টা করেছি। ছাড়পত্রের আবেদনের জমা রসিদকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা তাদের কাগজপত্রে “আবেদিত” লিখে রাখছি। তবে পরের বছর নবায়নের সময় তাদের ছাড়পত্র থাকতে হবে।’ তিনি জানান, হাসপাতালের লাইসেন্স পেতে বা লাইসেন্স নবায়ন করতে এখনো আবেদন করা যাবে। অনলাইনের আবেদনের প্রক্রিয়া উন্মুক্ত আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ছয় হাজার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে অথবা তারা আবেদন করেছে। তিন হাজারের বেশি হাসপাতাল লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এর মধ্যে এমনও হাসপাতাল বা ক্লিনিক রয়েছে, যা ১০ বছরে ধরে চলছে লাইসেন্স ছাড়া।

‘আমরা আবেদন প্রক্রিয়া একটু সহজ করার চেষ্টা করেছি। ছাড়পত্রের আবেদনের জমা রসিদকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা তাদের কাগজপত্রে “আবেদিত” লিখে রাখছি। তবে পরের বছর নবায়নের সময় তাদের ছাড়পত্র থাকতে হবে।
মো. ফরিদউদ্দীন মিয়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল)

অবশ্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের টাস্কফোর্স কমিটির চতুর্থ সভার কার্যবিবরণীতে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন করেনি, তাদের কার্যক্রম ও লাইসেন্স না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে টাস্কফোর্স লাইসেন্স ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিদর্শনে ও অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ১৭ নভেম্বর এ কার্যবিবরণীতে সই করেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১১ হাজার ৯৪০টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ২৪টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন ও নবায়ন করেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে আবেদন করেছে ২ হাজার ৮৯৩টি, রাজশাহীতে ১ হাজার ৮৯টি, ময়মনসিংহে ৪৯৮টি, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪০২টি, সিলেটে ৪০১টি, রংপুরে ৮৫৪টি, বরিশালে ৫৩৯টি, খুলনায় ১ হাজার ৩৪৮টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব হাসপাতালের লাইসেন্স ফি থেকে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা।

কেন দরকার পরিবেশ ও মাদক ছাড়পত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যেকোনো হাসপাতালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বিষয় রয়েছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, ধারালো বর্জ্য, সংক্রমণ সৃষ্টিকারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। কারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হলে পরিবেশের ক্ষতিসহ জনগণের স্বাস্থ্য বিপন্ন হতে পারে।

এ ছাড়া প্রতিটি হাসপাতালের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। কারণ, হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ (ক, খ, গ শ্রেণি) সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে কিছু আছে যা মাদক শ্রেণিভুক্ত এবং রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া প্রয়োগ করা যায় না। এ কারণেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন।

পরিবেশের ছাড়পত্র জমা না নিয়ে শুধু রসিদ দেখে লাইসেন্স দেওয়ায় সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছে পরিবেশসচিব জিয়াউল হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই হাসপাতাল ছাড়পত্র না–ও পেতে পারে। কেবল জমা রসিদকে বিবেচনায় নিয়ে কী করে একটি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, বুঝতে পারছি না।’

‘ওই হাসপাতাল ছাড়পত্র না–ও পেতে পারে। কেবল জমা রসিদকে বিবেচনায় নিয়ে কী করে একটি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, বুঝতে পারছি না।’
জিয়াউল হাসান, পরিবেশসচিব

একই কথা বলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আহসানুল জব্বারও। তিনি বলেন, অবশ্যই ছাড়পত্র জমা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

রিজেন্টের ঘটনা ও তৎপরতা

কোভিড-১৯ চিকিৎসাসেবা নিয়ে সমালোচনা ও বিনা মূল্যে সেবা দেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও রোগীদের কাছ থেকে বিল আদায় ও লাইসেন্স বিহীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে গত জুলাইয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দেয় সরকার। এরপর অনিয়ম বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালায়। কোনোটির কার্যক্রম বন্ধ, কোনোটি সিলগালা আবার কোনোটিকে জরিমানা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে এক মাস সময় দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে লাইসেন্স নবায়নের জন্য ২৩ আগস্টের মধ্যে আবেদন করতে বলে। তবে অনলাইনে সেই আবেদন এখনো করা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা হাসপাতালগুলো, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে অনেক সুযোগ দিয়েছি। এখনো বলছি যারা লাইসেন্স নেয়নি, নবায়ন করেনি, তারা দ্রুত তা করুক। কেউ যদি লাইসেন্স নবায়ন না করে, নিয়ম না মানে তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দিয়েছি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে।’

ঢাকার সিভিল সার্জন আবু হোসেন মো. মঈনুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখলাম, একজন আয়া প্রায় প্রতিদিন বাচ্চা প্রসব, গর্ভপাতসহ সব ধরনের অপারেশন করছেন। পরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিই।’

একাধিক সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, আবেদন পেয়ে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য তাঁরা হাসপাতাল পরিদর্শন শুরু করেছেন। তবে অনেক হাসপাতালে নানা ধরনের অসংগতি প্রত্যক্ষ করেছেন। ঢাকার সিভিল সার্জন আবু হোসেন মো. মঈনুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখলাম, একজন আয়া প্রায় প্রতিদিন বাচ্চা প্রসব, গর্ভপাতসহ সব ধরনের অপারেশন করছেন। পরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিই।’ অভিন্ন অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বীর। তিনি বলেন, ‘যেসব হাসপাতালে অসংগতি পাচ্ছি, তাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। যারা লাইসেন্স পেতে আবেদন করেনি, তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছি।’ তবে পরিবেশ ও মাদকের ছাড়পত্র না দেওয়ায় খুব বড় সমস্যা হবে না বলে মনে করেন তিনি। ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আমরা যদি দেখি সব ঠিক থাকে তাহলে লাইসেন্স বা নবায়নের জন্য সুপারিশ করছি।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

একাধিক হাসপাতালের মালিক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া ২০১৮ সাল থেকে বেশ জটিল করা হয়েছে। অনলাইনে আবেদনের যে নিয়ম করা হয়েছে, তা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। নবায়নের জন্য একাধিক ছাড়পত্র জমা দিতে বলা হয়, যা সংগ্রহ করতেই লেগে যায় এক বছর। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে জমা দেওয়া হলেও বেশির ভাগ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাসপাতাল পরিদর্শনে আসতে দেরি হয়।

লাইসেন্স পেতে হলে হাসপাতালের মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (নতুন প্রতিষ্ঠান) বা আয়কর প্রত্যয়নপত্র (পুরোনো প্রতিষ্ঠান), ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর, পরিবেশ ছাড়পত্র, মাদকের ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ক্ষতিকর ও অক্ষতিকর) চুক্তিপত্র ও চালানের স্ক্যান কপি অনলাইনে জমা দিতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তার হাসপাতাল পরিদর্শনকালে এসব নিরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা, সেবা প্রদানকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কর্তব্যরত চিকিৎসকের নাম ও কর্তব্যরত নার্সদের নাম-ঠিকানা, ছবি, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন, বিশেষজ্ঞ সনদ, নিয়োগ ও যোগদান বা সম্মতিপত্র জমা দিতে হয়। সাহায্যকারীদের তালিকা, অস্ত্রোপচার ও যন্ত্রপাতির তালিকাও হাসপাতালের প্রধানের স্বাক্ষরসহ জমা দিতে হয়।

দরকার নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন-সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব হাসপাতালগুলোয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ছাড়পত্রের চেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলো সরেজমিন পরিদর্শনের বিষয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের প্রথম কাজ স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা। সে প্রক্রিয়াটা সহজ হওয়া উচিত। ছাড়পত্র জমা দেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি। এ ছাড়া দরকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল বাড়ানো। তাহলেই হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নিবন্ধিত হতে বাধ্য হবে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ সুন্দর থাকবে।

মন্তব্য পড়ুন 0