সরকারি প্রকল্পের চাপে চ্যাপ্টা বাউনিয়া খাল

সরকারি প্রকল্পের চাপে চ্যাপ্টা বাউনিয়া খাল
সরকারি প্রকল্পের চাপে চ্যাপ্টা বাউনিয়া খাল

আট কিলোমিটার লম্বা বাউনিয়া খালকে দুই জায়গায় চেপে ধরেছে সরকারেরই দুই প্রকল্প। আর বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে চলছে প্রভাবশালীদের দখল।
খালটি সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাধিক চিঠি দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু ফলাফল শূন্য। শুশ্রূষাহীন খালটির শুরুর দিকের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে খাল ছাপিয়ে প্রতিদিন পানি উপচে পড়ছে দুই পারে।

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পাশ থেকে বাউনিয়া খালের শুরু। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই খালের প্রায় ১ হাজার ১৮২ মিটারের (জয়নগর থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর) মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। বাকি অংশের মালিক ওয়াসা। ওয়াসা জানিয়েছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খালটির প্রস্থ হওয়ার কথা ৬০ ফুট।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া ওয়াসার পানির পাম্পের পেছন থেকে সামনে বাগানবাড়ী বস্তির শেষ পর্যন্ত খালের দুই পাড় বাঁধাই করা ও বেশ প্রশস্ত। তবে বিভিন্ন জায়গায় জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। মাটি-বালুতে ভরে যাওয়ায় গভীরতা খুব কম।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম ও শফিকুল ইসলাম বলেন, এখানে জলাবদ্ধতার জন্য বৃষ্টির প্রয়োজন হয় না। আশপাশের এলাকার মানুষের ব্যবহৃত পানিনিষ্কাশন নালা দিয়ে খালে এসে পড়লেই খাল উপচে পানি বস্তিতে ঢোকে। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমন অবস্থা চলে।

খালের বাঁধাই করা পাড় যেখানে শেষ হয়েছে, তারপর থেকে আর অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটা যায় না। পুলিশ স্টাফ কলেজের পাশ দিয়ে ঘুরে আবার খালপাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, খালের পানি যেখান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তার ওপর সারি সারি টংঘর। এর একটু দূরেই ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প (বিআরপি)। এই প্রকল্পের বিপরীত পাশে রূপসী প্রো-অ্যাকটিভ ভিলেজ আবাসন প্রকল্প। এই দুই প্রকল্পের মাঝামাঝি এলাকায় খালের প্রশস্ততা অনেক কম। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, এটা ১০-১৫ ফুট হতে পারে। এরপর খালটি পূর্ব বাইশটেক বালুর মাঠ হয়ে গেছে জয়নগরের দিকে। জয়নগর গিয়ে দেখা গেছে, এখানে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এই অংশে খালটির প্রস্থে অনেকটা নালার মতো। এ প্রকল্প এলাকা ছাড়িয়ে সামনে গেলে খালের প্রশস্ততা আবার বেড়েছে।

খালটির মূল সমস্যা জয়নগর থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর পর্যন্ত। ওয়াসা বলছে, এই অংশে সরকারি দুই প্রকল্পের কারণে খাল সংকীর্ণ হয়ে গেছে। খালটির প্রশস্ততা ৬০ ফুট নিশ্চিত না করলে ঢাকা সেনানিবাস, পুরাতন বিমানবন্দর, ইব্রাহিমপুর, কাফরুলসহ মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর ওয়াসার পাঠানো পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ওয়াসা গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খালের জমি বুঝে পায়। কিন্তু জয়নগর অংশে প্রায় ১১৫ মিটার জায়গা জলমগ্ন থাকায় তখন বুঝে নেওয়া যায়নি। এখন এই অংশে ছোট নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। ২০১৬ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে জরুরি সভা হলেও সমাধান হয়নি।

এমন চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ওয়াসাকে এক চিঠিতে জানিয়েছে, ওই এলাকায় কোনো খাল নেই। নিচু এলাকা দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো।
জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জামান প্রথম আলোর কাছে দাবি করেছেন, ওয়াসার কোনো চিঠি তিনি পাননি। জয়নগর প্রকল্পটি খাল থেকে প্রায় ৩০ ফুট দূরে তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পের ভেতরে খালের জমি নেই।

আর ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর পাঠানো আরেক চিঠিতে ওয়াসা বলেছে, প্রকল্পের উন্নয়নকাজ করায় অর্থাৎ মাটি ভরাট ও আরসিসি কলাম নির্মাণ করায় খালের প্রশস্ততা হ্রাস পেয়েছে।

জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও প্রকল্পটির পরিচালক শামস আল মুজাদ্দিদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রকল্পের বিপরীত পাশে অর্থাৎ খালের অপর পারের বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান খালের জমি দখল করেছে। তারা প্রকল্পের কোটি টাকার স্থাপনাও নষ্ট করেছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে। তাঁদের প্রকল্পে খালের জমি নেই।
সার্বিক বিষয়ে জানতে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেছেন, খালটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রশস্ততা ৬০ ফুট না হলে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে। খালের যে অংশ নিয়ে সমস্যা, সেই অংশের মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চাইলেই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তাঁরা ৬০ ফুট খালের সীমানা নির্ধারণ করে দিলেই আর কোনো সমস্যা থাকবে না।