১২ এনজিওর প্রকল্পে অনিয়ম

জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ে ঠিকমতো কাজ করেনি ১২টি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। এর মধ্যে দুটি এনজিওর বিরুদ্ধে অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি এনজিও সরকারের গৃহায়ণ তহবিলের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ায় তাদের অর্থ ছাড় স্থগিত করা হয়েছে। বাকি এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে কাজ না করে টাকা উত্তোলন, নির্দিষ্ট খাতের বাইরে অর্থ ব্যয়সহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৬৩টি এনজিওর কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এসব তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। ২০১১ সালে ওই তহবিল থেকে এনজিওগুলোকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠেছিল। তখন সরকার এনজিওগুলোর প্রকল্প তদারকির জন্য পিকেএসএফকে দায়িত্ব দেয়।
২০১০ সালে সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের ১০ শতাংশ অর্থ এনজিওগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। এসব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি পিকেএসএফ থেকে এনজিওগুলোর কাজের মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে ১২টি প্রকল্পে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম পেয়েছে পিকেএসএফ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ও বিসিসিটিএফের সদস্য কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
টাকা নিয়ে লাপাত্তা: চট্টগ্রামের প্রোগ্রাম ফর রিসার্চ অ্যান্ড এলিমিনেশন অব পোভার্টি (প্রেপ) স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ল্যাট্রিন স্থাপনের জন্য ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পায়। সংস্থাটিকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছাড় দেওয়ার পর পিকেএসএফ থেকে কাজের অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো জবাব দেয়নি। পরে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে প্রেপ কার্যালয়ে যান পিকেএসএফের কর্মকর্তারা। সেখানে গিয়ে তাঁরা সংস্থাটির কার্যালয় বন্ধ দেখতে পান। একপর্যায়ে প্রেপের নির্বাহী পরিচালক এম এ মালেক টাকা ফেরত দিতে পিকেএসএফের কাছে সময় প্রার্থনা করে চিঠি দেন। পিকেএসএফের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে এম এ মালেকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গাছ কাগজে আছে, মাঠে নাই: খুলনার প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েশন অব প্রোগ্রেসিং আওয়ার ন্যাশনকে (আপন) গাছ লাগানোর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ বাবদ ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৬ লাখ টাকা ছাড় করার পর সংস্থার কাজ পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায় পিকেএসএফ। প্রকল্পের আওতায় ৫৭ হাজার ৭০০ চারাগাছ রোপণের কথা বলা হয়েছিল। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ৪৬ হাজার ১৬০টি চারার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আপনের প্রকল্পের মাধ্যমে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা সড়কের পাশে গাছগুলো রোপণের কথা ছিল। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই ছোট-বড় গাছ রয়েছে। অথচ প্রকল্প প্রস্তাবনায় ওই রাস্তার দুই পাশ খালি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। চারা রোপণের পর সেখানে পাহারাদার নিয়োগের কথা থাকলেও আপনের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি।
ঋণখেলাপি: বরিশালভিত্তিক সংস্থা এসএম ফাউন্ডেশনকে ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংস্থাটি সরকারের গৃহায়ণ তহবিলের টাকা ফেরত দিতে না পারায় খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। সংস্থার নামে ৩৪ লাখ টাকা মঞ্জুরের পর ঋণখেলাপির তথ্য জানা যায়। এরপর তাদের বাকি ৩৪ লাখ টাকা ছাড় করেনি পিকেএসএফ।
খুলনার মায়ের আচল মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থাকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নথি পর্যালোচনা করে পিকেএসএফ দেখতে পায় সংস্থাটি সরকারের গৃহায়ণ তহবিলের ঋণখেলাপি। তাদের অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়েছে।
অগ্রগতি অসন্তোসজনক: নেবুলা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি নামের একটি সংস্থাকে সুবিধাবঞ্চিত নারীর জন্য স্থায়িত্বশীল জীবিকায়ন প্রকল্পের আওতায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, উন্নত চুলা ও বনায়নের জন্য ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম কিস্তির ১০ লাখ টাকা ছাড় করার পর প্রকল্পের কাজ তদারক করতে গিয়ে পিকেএসএফ দেখতে পায় প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। সংস্থাটির নামে বরাদ্দ বাকি ১৫ লাখ টাকা ছাড় করা হয়নি।
কুমিল্লাভিত্তিক সমাজ উন্নয়ন সংস্থাকে বনায়ন প্রকল্পের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ এবং পুরো টাকা ছাড় করা হলেও সংস্থাটি এখনো প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
পটুয়াখালীর সোসিও ইকোনমিক রিসোর্স সেন্টারকে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১২ লাখ টাকা ছাড় করার পর সংস্থাটি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়ে। ফলে দ্বিতীয় কিস্তির ১৮ লাখ টাকা এখনো ছাড় করা হয়নি।
জামালপুরভিত্তিক সংস্থা বেকারকে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২১ লাখ টাকা ছাড়ের পর প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে পাওয়া যায় নানা অসংগতি।
মাদারীপুরের প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষা ও সেবা সংস্থা, সমাহার, বাস্তব, বাঁধন সোসাইটির কাজে অনিয়ম পেয়েছে পিকেএসএফ।