ফ্ল্যাটে গুলি, কর্মচারী আহত, আওয়ামী লীগ নেতার ছিনতাইয়ের ‘নাটক’

গুলিবিদ্ধ মো. মানিক
ছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর রমনা এলাকায় গতকাল রোববার এক যুবকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা ছিনতাই ছিল না। বরং মো. মানিক নামের ওই যুবক গুলিবিদ্ধ হন তাঁর নিয়োগকারী আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল হোসেন ওরফে বাচ্চুর ‘বাসায়’।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বলছে, বাসা থেকে গুলিবিদ্ধ মানিককে হাসপাতালে নিয়ে যান ইসমাইল। পরে এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে তিনি ছিনতাইয়ের নাটক সাজান।

ডিবির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মিশু বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, এটা ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা ইসমাইল হোসেন ও তাঁর বাসার কর্মী মহিউদ্দিন রুবেল নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাঁদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে আসল রহস্য বের করা যাবে।’

এই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে গুলিবিদ্ধ হন মো. মানিক
ছবি: প্রথম আলো

পুলিশ সূত্র জানায়, ইসমাইল হোসেন ঢাকার শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি। তিনি আগামী কমিটিতে সভাপতি পদপ্রার্থী। ইসমাইল পরিবহনশ্রমিকদের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর পরিবহন ব্যবসা রয়েছে।

রমনা এলাকায় গুলির খবর পুলিশ গতকাল বিকেলের দিকে পায়। পুলিশ সূত্র জানায়, ইসমাইলই পুলিশকে বলেন, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির সামনে গুলির ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ সেখানে যায়। খোঁজখবর নেয়।

রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আসে, কর্ণফুলীর সামনে মানিক নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু আমরা কর্ণফুলী ও আশপাশের এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে এ ধরনের কোনো ঘটনার সত্যতা পাইনি।’

ডিবি সূত্র জানায়, ইসমাইল হোসেনের বাসার নিরাপত্তাকর্মী ও আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা পুলিশকে জানান, ইসমাইল নিজেই মানিককে কোলে করে বাসার নিচে নিয়ে আসেন। গাড়িতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

রমনার বেইলি রোডের পাশে লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টে ইসমাইলের বাসা। ডিবি সূত্র বলছে, ওই বাসায়ই গতকাল বিকেলে গুলিবিদ্ধ হন মানিক। ইসমাইল শুরুতে পুলিশের কাছে বলেন, ছিনতাইকারীরা মানিককে গুলি করেছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি মুঠোফোনে খবর পেয়ে হাসপাতালে যান। কিন্তু তদন্তে জানা যায়, ইসমাইল নিজেই মানিককে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।

আজ সোমবার দুপুরে লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টে গেলে ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক রমজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গুলির শব্দ শোনেননি। তবে মানিককে আহত অবস্থায় নিতে যেতে দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ইসমাইল ও তাঁর সহকারী মহিউদ্দিন থাকেন। ইসমাইলের পরিবারের সদস্যরা থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। মানিক ইসমাইলের পরিবহন ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তিনি প্রায় প্রতিদিনই ইসমাইলের ফ্ল্যাটে আসতেন।

ইসমাইল ও তাঁর কর্মী মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পুলিশ পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করেছে। জব্দ করা হয়েছে একটি গাড়ি, যেটিতে করে গুলিবিদ্ধ মানিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, শুরুতে পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে চাইলেও গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইসমাইল দাবি করেন, তাঁর লাইসেন্স করা পিস্তল পরিষ্কার করছিলেন মহিউদ্দিন। এ সময় অসাবধানতাবশত ঘটনাটি ঘটে। মহিউদ্দিনও একই বক্তব্য দিয়েছেন।

তবে ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মহিউদ্দিন তাঁর নিয়োগকর্তাকে বাঁচাতে এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন বলে মনে করছেন তাঁরা।

মানিকের বুকের এক পাশে গুলি লেগেছে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।