চুলে আটকে থাকা আঁকড়ার গুটি খুলে দিল হত্যার রহস্য
২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের পুংলীপাড়ায় স্বামী আবদুর রহমানের বাড়ি থেকে আজমিরা খাতুনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
আজমিরা খাতুনের মৃত্যুকে প্রথমে সবাই আত্মহত্যা ভেবেছিল। স্বামীর পরিবারের দাবি ছিল, গভীর রাতে ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস নিয়েছিলেন তিনি। সুরতহাল প্রতিবেদনে বড় কোনো আঘাতের চিহ্নও ছিল না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও চিকিৎসক আত্মহত্যার পক্ষে মত দেন। থানা-পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছিল যে আজমিরা আত্মহত্যা করেছেন।
তবে আজমিরার বাবা জুরান আলী শেখ বিষয়টি মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি আদালতে মামলা করলে সেটির তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে। তদন্তের শুরুতেই আজমিরার লাশের ছবি দেখে সন্দেহ করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। ছবিতে দেখা যায়, মৃতদেহের চুলে আটকে আছে কয়েকটি আঁকড়ার গুটি। কেন ঘরের ভেতরে মারা যাওয়া এক নারীর চুলে থাকবে ডোবার পাশের জঙ্গলে জন্মানো আঁকড়াগাছের গুটি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেরিয়ে এল ভয়ংকর এক হত্যার গল্প।
প্রথমে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ির পাশের ডোবার কাছের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে। সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু পরে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গভীর রাতে আবার লাশ তুলে ধুয়ে ঘরে এনে খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়। সকালে ছড়িয়ে দেওয়া হয় আত্মহত্যার গল্প।
তদন্তে উঠে আসে, আজমিরাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর প্রথমে লাশ গুম করার চেষ্টা করেন তাঁর স্বামী ও পরিবারের লোকজন। প্রথমে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ির পাশের ডোবার কাছের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে। সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু পরে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গভীর রাতে আবার লাশ তুলে ধুয়ে ঘরে এনে খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়। সকালে ছড়িয়ে দেওয়া হয় আত্মহত্যার গল্প। কিন্তু জঙ্গলে নেওয়ার সময়ই আজমিরার চুলে লেগে যায় আঁকড়াগাছের গুটি, যা শেষ পর্যন্ত খুলে দেয় হত্যার রহস্য।
২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের পুংলীপাড়ায় স্বামী আবদুর রহমান ভোলার বাড়ি থেকে আজমিরা খাতুনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় থানা-পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা করে। এক মাসের মধ্যেই থানা-পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আজমিরার বাবা জুরান আলী আদালতে মামলা করেন। ওই মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। তারপর এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়।
পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কখনো কখনো একটি ছোট্ট আলামতই বদলে দিতে পারে পুরো তদন্তের গতিপথ। আজমিরা খাতুনের চুলে আটকে থাকা আঁকড়ার গুটির সূত্র ধরেই জানা গেছে যে তিনি আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের আজমিরা খাতুন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
আজমিরার স্বামীর বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে ডোবার পাশের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে সদ্য খোঁড়া একটি গর্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। পিবিআই বলছে, থানা-পুলিশ এ মামলার ক্ষেত্রে দায়সারা তদন্ত করেছে।
পাঁচজন মিলে হত্যা
আজমিরার বাবা জুরান আলী শেখ ও স্বামী আবদুর রহমান ভোলার বাড়ির দূরত্ব ৪০০ গজ। প্রেমের সম্পর্কের জেরে গ্রাম্য সালিসের চাপে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে আবদুর রহমানের সঙ্গে আজমিরার বিয়ে হয়। কিন্তু সেই বিয়ে সহজভাবে নেয়নি আবদুর রহমানের পরিবার। আজমিরার পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তাঁকে বাবার বাড়িতেও যেতে দেওয়া হতো না। প্রায়ই চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার দিন (২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল) রাত ১১টার পর আজমিরা খাতুনকে পরস্পর যোগসাজশে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তাঁর স্বামী আবদুর রহমান, শ্বশুর সাঈদ আকন্দ, শাশুড়ি বুলবুলি বেগম এবং ননদ আকলিমা বেগম ও আমেনা বেগম। লাশ বাড়ির পশ্চিম পাশে ডোবার কাছের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় গভীর রাতেই লাশ আবার তুলে আনা হয়। এরপর লাশ ধুয়ে ঘরের খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়। পরদিন সকাল ছয়টার দিকে আজমিরার শ্বশুর সাঈদ আকন্দ ও শাশুড়ি বুলবুলি বেগম প্রতিবেশীদের ডেকে এনে দাবি করেন যে আজমিরা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গ্রামবাসী ফাঁসের রশি দেখতে চাইলে তাঁরা বলেন, আজমিরা ওড়না দিয়ে ফাঁস দিয়েছেন। তবে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে গ্রামবাসী অনেকের সন্দেহ ছিল।
পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কখনো কখনো একটি ছোট্ট আলামতই বদলে দিতে পারে পুরো তদন্তের গতিপথ।
থানা-পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তদন্তের শুরুতেই পিবিআই কর্মকর্তাদের নজরে আসে তিনটি অসংগতি। এক. মৃত্যুর পরপর তোলা ছবিতে দেখা যায়, আজমিরার গলার নিচের দিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কালচে দাগ রয়েছে। অথচ সাধারণত গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় এমন দাগ গলার ওপরের দিকে থাকার কথা।
দুই. ছবিতে মৃতদেহের চুলে আঁকড়াগাছের গুটি, মুখে মাটি এবং পরনের কাপড় ভেজা দেখা যায়। এসব আলামত দেখে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয় যে আজমিরাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিন. একই সময়ে এলাকায়ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
এ তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত শুরু করে পিবিআই। পরে সুরতহাল তৈরিতে সহায়তাকারী তিন নারী সাক্ষী জবানবন্দিতে জানান, মৃতদেহের শরীর ভেজা ছিল, মুখে মাটি লেগে ছিল এবং চুলে অনেক আঁকড়ার গুটি আটকে ছিল। দাফনের আগে লাশ ধোয়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও জানান, লাশের মাথা থেকে ১৫ থেকে ২০টি আঁকড়ার গুটি ফেলেছিলেন তাঁরা। এ ছাড়া ঘটনার পর আজমিরার স্বামীর বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে ডোবার পাশের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে সদ্য খোঁড়া একটি গর্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। পিবিআই বলছে, থানা-পুলিশ এ মামলার ক্ষেত্রে দায়সারা তদন্ত করেছে। আজমিরার লাশ উদ্ধারের পর নানা ঘটনার মধ্য দিয়েই মনে হয়েছে যে এটি আত্মহত্যা নয়। অথচ থানা-পুলিশ এসব বিষয় আমলেই নেয়নি।