অনলাইন জুয়ায় কোটি টাকার লেনদেন, থাকতেন বিলাসবহুল রিসোর্টে, চড়তেন বিএমডব্লিউতে

অনলাইন জুয়ায় জড়িত অভিযোগে গাজীপুরের একটি রিসোর্ট ও কুমিল্লার একটি আবাসিক হোটেল থেকে এই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারেছবি: ডিএমপির সৌজন্যে

অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে সাড়ে ৬ হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়া পরিচালনার মাধ্যমে এই চক্রের সদস্যরা দিনে প্রায় ৫ কোটি টাকার মতো লেনদেন করতেন।

মো. আরিফুল ইসলাম (২৩) এই চক্রের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। গতকাল বুধবার রাতে গাজীপুরের একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে আরিফুলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকি তিনজনকে কুমিল্লার একটি আবাসিক হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অপর পাঁচজন হলেন মো. আরমান হোসেন (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ (২৩) ও মশিউর রহমান (২০)।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সেখানে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম চক্রের সদস্যদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড ছাড়াও ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, একটি ল্যাপটপ, ৭০টির বেশি মুঠোফোন এবং ১টি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়। ডিভাইসগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার মতো লেনদেন করা হতো।

আরিফুল ইসলামকে আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। আরিফ অবৈধ উপার্জনের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করেন। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে তাঁর একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এরপর তিনি আবার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনেছেন।

ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেখান থেকে তাঁকে ধরেছি সেখানেও তিনটি রুম তিনি বুকিং দিয়েছিলেন। তিনি যে রুমে ছিলেন, সেই রুমের ভাড়া দিনে ৫০ হাজার টাকা। তিনি এখানে হয়তো চার-পাঁচ দিন থাকতেন। এরপর পুলিশ যখন তাকে শনাক্ত করবে, ঠিক তখন তিনি জায়গা পরিবর্তন করে অন্য কোনো হোটেলে বা কক্সবাজারে নামী-দামি হোটেলে রুম ভাড়া করে থাকতেন। দীর্ঘদিন তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই কৌশল অবলম্বন করতেন।’

যেভাবে হয় জুয়ার অর্থ লেনদেন

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশন সাইবার পর্যবেক্ষণের (মনিটরিং) মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বেশ কিছু ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপলিকেশন শনাক্ত করে। ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনলাইন জুয়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাইটগুলোয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিন শেষে হিসাব করে লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এই অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) থেকে ক্রিপ্টো কারেন্সি কেনা হয়। এরপর ওই ক্রিপ্টো কারেন্সি পাঠানো হয় অনলাইন জুয়া পরিচালনার মূল কোম্পানির দেওয়া ওয়ালেটে। এসব কোম্পানি মধ্যে রয়েছে পে ক্যাশমা, গো পে, লাকি পে, এল কিউ পে, এক্সি পে, কুল পে প্রভৃতি।

বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চীনের নাগরিকেরা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি এই চক্রের বস নাতান। তিনিও চীনের নাগরিক। গো পে নামের কোম্পানির মাধ্যমে এই চক্রের কার্যক্রম চলত।’

দেশে জুয়ার সাইট থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান শফিকুল বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের দেশে ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ট্রানজেকশন (লেনদেন) হচ্ছে।’

গ্রেপ্তার ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় চীনা থেকে। দেশের চক্রগুলো শুধু কমিশন পাওয়ার ভিত্তিতে কাজ করেন।