ওই তিন আসামি হলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সৈয়দ ইকবাল, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য আকরাম উদ্দিন ওরফে পাভেল ও বিএনপির কর্মী জোনায়েদ মেহেদী। তিনজনেরই বাড়ি হাটহাজারীতে।

জামিনে থাকা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সৈয়দ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে থেকে মণ্ডপের তোরণে হামলার মামলায় আসামি হয়েছেন শুনে তিনি অবাক হয়েছেন। একই কথা জানিয়েছেন বাকি দুজনও।

প্রথম আলোতে প্রতিবেদন ও আসামিদের অব্যাহতি

‘পূজামণ্ডপের তোরণ ভাঙচুর: ৬ মাস ধরে কারাগারে থাকা বিএনপির তিনজনও আসামি’ শিরোনামে গত বছরের ২০ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশ ওই তিনজনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেননি। তাঁদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনও করেনি।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়াউদ্দিন আজ শুক্রবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, মামলায় আসামি হলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন, সব তথ্যপ্রমাণ পেলেও সঙ্গে সঙ্গে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা অভিযোগপত্র থেকে আসামির নাম বাদ দিতে হয়। মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিতে হয়।

হাটহাজারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব শর্মা বলছেন, এজাহারে থাকা তিনজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণে জড়িত থাকার তথ্য না পাওয়ায় তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

একই মন্তব্য করেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হাটহাজারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইরফান উদ্দীন রাজিব।

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেছেন, ঘটনার সময় কারাগারে থাকা তিন আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি না দিলে প্রকৃত আসামিরা সুযোগ নিতেন। তিনি বলেন, এই সুযোগে জড়িত আসামিরাও দাবি করতেন, পুলিশ খামখেয়ালিপনা করে তাঁদের আসামি করেছে। এতে মামলা দুর্বল হয়ে যেত। আসামিরা সহজে পার পেয়ে যেতেন।

যেভাবে কারাবন্দীরা আসামি হলেন

কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগের জেরে গত বছরের ১৩ অক্টোবর হাটহাজারী উপজেলার সরকারহাট বাজারসংলগ্ন সোমপাড়া সর্বজনীন পূজামণ্ডপের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা ও মণ্ডপের গেট ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

পরদিন এ ঘটনায় হাটহাজারী থানার এসআই আবিদুর রহমান বাদী হয়ে ৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার ৬১ আসামির মধ্যে ১৫ নম্বরে রয়েছে জোনায়েদ মেহেদীর নাম। ৫৩ নম্বরে সৈয়দ ইকবাল ও ৫৫ নম্বরে আকরাম উদ্দিন।

আসামিদের আইনজীবী রিয়াদ উদ্দিন বলেন, তদন্ত শেষে হাটহাজারী থানা-পুলিশ আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয়। সেখানে ৮৮ জনকে আসামি করা হয়। অব্যাহতি দেওয়া হয় সৈয়দ ইকবালসহ বিএনপির তিন কর্মীকে। গত ৩০ অক্টোবর আদালত পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন।

কারা সূত্র বলছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে গত বছরের ২৬ মার্চ হাটহাজারীতে বিক্ষোভ-সহিংসতা হয়েছিল। মণ্ডপে হামলার ঘটনার ছয় মাস আগে গত বছরের ১৬ এপ্রিল হেফাজতের এই সহিংসতার ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় কারাগারে যান সৈয়দ ইকবাল। এরপর একই মামলায় জোনায়েদ মেহেদীকে ২০ এপ্রিল ও আকরাম উদ্দিনকে ১০ মে কারাগারে পাঠানো হয়।

ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বাদী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

কারাগারে থাকা তিনজনকে আসামি করা মামলার বাদী হাটহাজারী থানার সাবেক এসআই আবিদুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। বর্তমানে তিনি নগরের হালিশহর থানায় কর্মরত। আবিদুর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, কারাগারে থাকা তিনজনকে মামলার আসামি করা পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করে এ ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম শফি উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় সোর্সের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁদের আসামি করলেও তদন্তে জড়িত থাকার তথ্য না পাওয়ায় তাঁদের বাদ দিয়েছে। এটা দোষের কিছু নয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ঘটনাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যই পুলিশ কর্মকর্তা এ কাজ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যে পুলিশ সদস্য যাচাই-বাছাই না করে কারাগারে থাকা লোককে আসামি করেছেন, তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত। না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটবে। সুযোগ নেবেন প্রকৃত আসামিরা।