‘বেচাবিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন ৩০০ টাকা দেওয়া লাগে’

  • পার্কিংয়ের ইজারাদার আওয়ামী লীগ নেতা।

  • চাঁদা তোলা হয় শ্রমিক দল নেতা সুমন ভূঁইয়া এবং যুবদল নেতা আহমেদ হোসেন সোবহান ও জুয়েল হাওলাদারের নামে।

বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ডপ্রথম আলো

বেনাপোল থেকে ট্রাকভর্তি ফল নিয়ে পুরান ঢাকার বাদামতলীতে এসেছেন মেহেদী হাসান। তাঁর ট্রাকটি রাখা ছিল বুড়িগঙ্গাতীরের বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ডে, যেটি বাকল্যান্ড বাঁধ নামে পরিচিত।

কিছুক্ষণ পর সাদা খাতা হাতে এক ব্যক্তি মেহেদীর কাছে এলেন। দুই হাজার টাকা নিলেন। কিন্তু কোনো রশিদ দেননি।

ঘটনাটি গত ৩ জুলাইয়ের। জানতে চাইলে মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, এখানে ফলভর্তি ট্রাক রাখলেই দুই হাজার টাকা দিতে হয়। খালি ট্রাক রাখলে দিতে হয় এক হাজার।

টাকা দেওয়া থেকে রেহাই পান না কোনো ট্রাকচালকই। না দিতে চাইলে মারধরের শিকার হতে হয়। তাই চুপচাপ টাকা দিয়ে দেন চালকেরা।

মাসুম বিল্লাহ নামের আরেক ট্রাকচালক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুনেছি এরা ইজারাদারের লোক। আমরা বাইরে থেকে এসেছি। যে যা বলে, তাই আমাদের শোনা লাগে।’

পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে আসা ট্রাক থেকে এভাবেই চাঁদাবাজি চলছে বছরের পর বছর। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে সরকারি ইজারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে চাঁদাবাজেরা।

বাদামতলীর ফলের আড়তে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয় পার্কিংয়ের জন্য। সরকারি ফি ১০০ টাকা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তালিকা অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গাতীরের ওই পার্কিংয়ের জায়গায় ট্রাক, বাস ও কাভার্ড ভ্যান রাখার নির্ধারিত ফি ১০০ টাকা, মিনিবাস ও মিনিট্রাকের জন্য ৬০ টাকা, মাইক্রোবাসের জন্য ৫০ টাকা এবং প্রাইভেট কার ও জিপের (এসইউভি বা স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল) জন্য ৩০ টাকা। কিন্তু ট্রাক থেকে নেওয়া হয় এক থেকে দুই হাজার টাকা। কনটেইনারবাহী বড় যান (লরি) থেকে নেওয়া হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা।

বাদামতলীর ওই খালি জায়গায় একসঙ্গে ৬০ থেকে ৭০টি ফলের ট্রাক রাখা যায়। ট্রাক ছাড়া অন্য যানবাহন রাখা হয় না বললেই চলে। কারণ, সেটি আড়ত এলাকা এবং ট্রাকের সংখ্যা অনেক বেশি।

বাতামতলি ঘাট সংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ড
ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার সদরঘাট থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তার এক পাশে ফলের আড়ত এবং অন্য পাশে বুড়িগঙ্গা নদী। নদীপারের অংশে অবৈধ স্থাপনা ছিল। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জায়গাগুলো উদ্ধার করে। পরে সেখানে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে, সীমানাপ্রাচীর এবং যানবাহন রাখার পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাদামতলী ঘাট ও পার্কিং ইয়ার্ড ইজারা দেওয়া হয়।

বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, মামলার কারণে বিগত দুই অর্থবছরে বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ড নতুন করে ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ইজারার মেয়াদ মাসে মাসে বাড়ানো হচ্ছে। সেই সুযোগে চলছে বাড়তি টাকা আদায়।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নির্ধারিত হারের বেশি ফি নেওয়ার নিয়ম নেই। যদি কেউ নেয়, তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। তাহলে তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন।

অবশ্য স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, চাঁদার টাকার ভাগ বিআইডব্লিউটিএর অসাধু কর্মকর্তাদের কাছেও যায়। এ কারণে বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়টি জেনেও তাঁরা চুপ থাকেন। লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় থাকাটা একটা অজুহাত।

‘ছয়জন টাকা তুলি’

সরেজমিন গত ৩ জুলাই দেখা যায়, পার্কিং ইয়ার্ডের ভেতরে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি একটি রিকশা মেরামতের দোকানে বসে এক ব্যক্তি টাকা গুনছেন। তাঁর নাম সোহরাব হোসেন। জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন।

কিসের টাকা গুনছেন, এই প্রশ্নে সোহরাব বলেন, ‘ঘাট ইজারা নিয়েছেন ভাইয়েরা। আমি জেটি পয়েন্টের দায়িত্বে আছি। টাকা কালেকশন করেছি, এখন হিসাব করছি।’ ইজারাদার কে জানতে চাইলে তিনি নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে ছয়জন টাকা তুলি, পরে ওপর মহলে পাঠিয়ে দিই। আমরা দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরিভুক্ত কর্মচারী বলতে পারেন। তাই এত কিছু বলা ঠিক হবে না।’

যে ছয়জন টাকা তোলেন, তাঁদের মধ্যে সোহরাব ছাড়াও মো. মুন্না, কবীর হোসেন ও মো. শাহীনের নাম জানা গেছে। বাকি দুজনের নাম জানা যায়নি। এঁরা সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

বাদামতলীর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সেখানে দৈনিক দেড় শতাধিক ট্রাক আসে। প্রতি ট্রাকে দুই হাজার টাকা করে দিনে চাঁদা ওঠে তিন লাখ। মাসে ওঠে ৯০ লাখ টাকা। খালি ট্রাকের হিসাব বিবেচনায় নিলে মাসে চাঁদার পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পার্কিং ইয়ার্ডটিতে চা ও খাবারের দোকান রয়েছে ৭০টির মতো। এসব দোকানকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্কিং ইয়ার্ডের একটি ছোট চায়ের দোকানের মালিক প্রথম আলোকে বলেন, বেচাবিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন বেলা ১১টার সময় ৩০০ টাকা দেওয়া লাগে। টাকা না দিলে দোকান তুলে দেয়।

ইজারাদার আ.লীগ নেতা, টাকা তোলে বিএনপি

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পার্কিং ইয়ার্ডটি এক বছরের জন্য ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় ইজারা নেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল করিম (করিম হাজি)।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর পার্কিং ইয়ার্ডটির নিয়ন্ত্রণ নেন শ্রমিক দল ও যুবদলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা। সূত্র বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নতুন ইজারার দরপত্রের সময় ঘনিয়ে এলে করিম হাজির পক্ষে মামলা করা হয়। ফলে নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে পারছে না বিআইডব্লিউটিএ।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, আদালতে মামলা চলমান থাকায় নতুন করে পার্কিং ইয়ার্ডের দরপত্র আহ্বান করা যাচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ২০২৫ সাল থেকেই পুরোনো ইজারার মেয়াদ এক মাস করে বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। মামলা নিষ্পত্তি হলে নতুন করে ইজারা দেওয়া যাবে।’

ফল ব্যবসায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক দল ও যুবদলের তিনজন নেতা পার্কিংটি নিয়ন্ত্রণে রেখে চাঁদাবাজি করছেন। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রচারকারী সুমন ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের অন্তর্গত কোতোয়ালি থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহমেদ হোসেন সোবহান এবং কোতোয়ালি থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল হাওলাদার।

ঢাকা মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি সুমন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘করিম হাজি ৫ তারিখের (জুলাই গণ-অভ্যুত্থান) পর পালিয়ে গেছেন। এরপর তিনি আমাদের সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন, পাওয়ার (ক্ষমতা) দিয়েছেন এবং বিআইডব্লিউটিএকে বলে দিয়েছেন। তখন থেকে ইজারার মাসিক হাজিরামূল্য দিয়ে আমরা পরিচালনা করছি।’

আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবদুল করিম আসলেই বুঝিয়ে দিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ। মো. হৃদয় নামের একজন তাঁর স্থানীয় ব্যবসা দেখভাল করেন। তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

ফলের দামে যোগ হয় চাঁদার টাকা

বাদামতলী ফলের আড়ত দেশের বড় পাইকারি ফল ব্যবসাকেন্দ্রের একটি। আমদানি করা ও দেশীয় ফল এই ব্যবসাকেন্দ্রের মাধ্যমে ঢাকার খুচরা বাজারে যেমন আসে, তেমনি সারা দেশে যায়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে বাদামতলী ফলের বাজারের গোড়াপত্তন ব্রিটিশ আমলে, ১৯৩৫ সালের দিকে। তখন চার থেকে পাঁচজন ব্যবসায়ী মিলে এই স্থানে ফলের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেন। প্রায় শতবর্ষ পুরোনো এই বাজারে প্রতিদিনই প্রায় শতকোটি টাকার বেচাকেনা হয়।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, শুধু পার্কিং ইয়ার্ড নয়, বাদামতলীতে ট্রাক ঢুকলেই চাঁদা দিতে হয়। চাঁদার কারণে ফলের দাম বাড়ে। স্থানীয় ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে জুন মাসে তিনি পার্কিং খরচ কমানোর জন্য বলে দিয়েছিলেন। তবে কাজ হয়নি।

ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সব খরচই ফলের দামের ভেতরেই ঢোকে। পার্কিং ফি বেশি দিতে হলে সেটা ধরেই তো ফলের দাম নির্ধারণ করা হয়।