এই প্রতারকের নাম ওয়াস কুরুনী (২৪)। র‍্যাব বলেছে, তিনি ভণ্ড কবিরাজ। আজ বুধবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত পাগড়ি, গলার হার, দুল, টিকলি, মন্ত্র লেখা চারটি কাগজ, তাবিজের খোসা, বনাজি কাঠের লাঠি, হরিণের চামড়া, বনজ গাছগাছালি, শিঙা, কড়ি, হাড়ের টুকরা, ফুল ও মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে।

আজ দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-৩–এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ভণ্ড কবিরাজ ওয়াস কুরুনীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ওয়াস বলেছেন, কবিরাজ আলী আশরাফ, তান্ত্রিক কবিরাজ ও হুমায়ুন আহমেদ নামে তিনটি বেনামি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাঁর। এসব অ্যাকাউন্টে তিনি চিরাচরিত সমস্যা, যেমন গোপন রোগের চিকিৎসা, দাম্পত্য কলহ, বিয়ে না হওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, চাকরি না পাওয়া, জমিজমার ঝামেলা, কাউকে বশ করার প্রবণতা, বাণ মারা ও মামলায় জয়ী হওয়ার মন্ত্র, বিয়ের প্রস্তাব ও প্রেমে সফল হওয়ার তাবিজ—এ রকম নানান শিরোনামে পোস্ট করেন। তাঁর ২০–২২ জন এজেন্ট রয়েছেন। তাঁদের কাজ, ফেসবুকের পোস্টগুলো বারবার শেয়ার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রতারণার শিকার বানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়া। তিনি (ওয়াস কুরুনী) ও সহযোগীরা মিলে নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে অর্থ লেনদেন এবং কুরিয়ার সার্ভিসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার আদায় করেন।

র‍্যাব পরিচালক আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, বিভিন্ন স্কুল–কলেজ ও মাদ্রাসাপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিশানা বানিয়ে ওয়াসের নিয়োগ করা নারী এজেন্টরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের সঙ্গে মিশে যান। অভিভাবক পরিচয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গোপন সমস্যা নিয়ে কথা বলেন তাঁরা। কবিরাজি চিকিৎসা ও তাবিজ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে প্রকৃত অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করেন। তাঁদের কথার ফাঁদে পড়ে ভুক্তভোগীরা টাকা, অলংকার ও পারিবারিক যেকোনো মূল্যবান সম্পদের বিনিময়ে হলেও সমস্যা সমাধানে মরিয়া হয়ে ওঠেন। পরে তাঁদের মুঠোফোন নম্বর জোগাড় করে ওয়াস কুরুনীকে দিতেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা।

ওয়াসকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র‍্যাব পরিচালক বলেন, ওয়াস তাঁর নিশানা বানানো নারী ও পুরুষদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চ্যাটিং ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাঁদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। প্রাথমিকভাবে ‘জিন চালানের মাধ্যমে ওষুধ দেওয়া ও গায়েবি চিকিৎসা’ শুরু করার জন্য বিশেষ কিছু উপাদান যেমন, ইঁদুরের মাংস, বানরের লোম, বাদুড়ের পা, গভীর রাতে শ্মশান থেকে মাটির কলসিতে পানি আনাসহ বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করতে বলতেন। তখন ভুক্তভোগীরা জানাতেন, এসব তাঁদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তখন তিনি এগুলো সংগ্রহ করার বদলে মোটা অঙ্কের টাকা কিংবা স্বর্ণালংকার দাবি করতেন।

ওয়াস ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের আস্থা অর্জনের জন্য নিজের ভুয়া কবিরাজি চিকিৎসার স্থিরচিত্র ও ভিডিও তাঁদের কাছে পাঠাতেন। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা মুঠোফোনে এ রকম অনেক ছবি ও ভিডিও চিত্র পাওয়া গেছে। কেউ তাঁকে অবিশ্বাস বা সন্দেহ করলে ‘দুষ্ট জিন’ দিয়ে ক্ষতি করার হুমকি দিতেন। এভাবে তিনি ভয়ভীতি দেখিয়ে ধাপে ধাপে টাকা নিতেন; তবে কখনো ভুক্তভোগীদের সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন না। নারী ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায়ের জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেন।

আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, ওয়াস গত তিন বছরে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রতারণার অর্থে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে বাড়ি করেছেন তিনি। টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার পর তিনি ও তাঁর সহযোগীরা ভুক্তভোগীদের মুঠোফোন নম্বর ব্লক করে দেন। এরপর ভুক্তভোগীরা তাঁদের দেওয়া অর্থ ও অলংকার ফেরত পেতে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

ওয়াস সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে ভুয়া কবিরাজি  শুরু করেন তিনি। প্রথমে যাত্রীবাহী বাসে তাবিজ বিক্রি ও ‘বশীকরণের’ বই বেচতেন। চার বছর আগে লৌহজংয়ে বিয়ে করে সেখানেই বসবাস করছেন। প্রতারণায় তাঁর স্ত্রী তাঁকে সহায়তা করে আসছিলেন।