ফেসবুক হ্যাক, প্রতারণা, তথ্য চুরি এক প্ল্যাটফর্মেই মিলবে সমাধান

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি বিভাগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সিআইআরএস উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামছবি: সিআইআরএস সৌজন্যে

সাইবার প্রতারণা, ফেসবুক আইডি হ্যাক, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো ঘটনায় এখন থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানাতে পারবেন নাগরিকেরা। সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম (সিআইআরএস) নামের এই প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠানো এবং নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি বিভাগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সিআইআরএস উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানাতে নাগরিকদের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো। নতুন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এবং পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা যাবে। একই সঙ্গে কোন ধরনের সাইবার অপরাধ বেশি ঘটছে, কোথায় ঝুঁকি বাড়ছে বা কী ধরনের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

যেভাবে মিলবে সেবা

জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির (এনসিএসএ) অধীন চালু হওয়া সিআইআরএস একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। report.ncsa.gov.bd ওয়েব ঠিকানায় গিয়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা সাইবারসংক্রান্ত ঘটনার অভিযোগ জানাতে পারবেন।

এই প্ল্যাটফর্মে হ্যাকিং বা অননুমোদিত প্রবেশ, সাইবার প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি, গুজব বা অপতথ্য, তথ্য ফাঁস, অনলাইন পরিচয় চুরি, ক্ষতিকর কনটেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার ঘটনার অভিযোগ করা যাবে। অভিযোগ করার সময় কী ঘটেছে, কখন ঘটেছে, কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে—এসব তথ্যের পাশাপাশি স্ক্রিনশট, ছবি, নথি বা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংকও যুক্ত করা যাবে।

অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ইউনিক কমপ্লেইন্ট আইডি তৈরি করবে। ওই নম্বর ব্যবহার করে অভিযোগকারী পরবর্তী সময়ে নিজের অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারবেন। অভিযোগটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, যাচাই হয়েছে কি না বা নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, এসব তথ্যও দেখা যাবে।

রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রথমে উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেটি যাচাই করবেন। প্রয়োজনে অভিযোগকারীর কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হবে। উপজেলা পর্যায়ে সমাধান সম্ভব না হলে অভিযোগটি জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে।

আর জটিল বা জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কোনো ঘটনা সরাসরি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিতে পাঠানো হবে। সেখানে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি রিপোর্ট গ্রহণ, যাচাই, বিশ্লেষণ, এসকেলেশন, প্রতিক্রিয়া, পর্যবেক্ষণ এবং নিষ্পত্তি—এই ধাপগুলো অনুসরণ করে সম্পন্ন হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা নির্ধারিত মাত্রার অ্যাকসেসের মাধ্যমে সিস্টেমের সারসংক্ষেপ, পরিসংখ্যান ও প্রবণতা দেখতে পারবে। এর ফলে সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা তদারকি আরও সহজ হবে।

যা বলছে সরকার

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ই-কমার্স ও সরকারি সেবাসহ সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, র‍্যানসমওয়্যার, অনলাইন প্রতারণা ও পরিচয় চুরির ঝুঁকিও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম (সিআইআরএস) চালুর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান—সবাই সহজে ও দ্রুত সাইবার ঘটনার অভিযোগ জানাতে পারবেন।

মন্ত্রী বলেন, এটি শুধু অভিযোগ গ্রহণের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থা তৈরির একটি উদ্যোগ। একই সঙ্গে ন্যাশনাল রেটিং সিস্টেম (এনআরএস) সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তাসক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিরাপদ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

একই অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করা হয়েছে ন্যাশনাল রেটিং সিস্টেম (এনআরএস)। এটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তাসক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় ৪টি প্রধান স্তম্ভ ও ১৩১টি মূল্যায়ন সূচকের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ থেকে ই পর্যন্ত গ্রেড দেওয়া হবে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও ডিজিটাল সেবার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই রেটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কোথায় অডিট বা নিরাপত্তা জোরদার করা দরকার এবং কীভাবে বাজেট ও সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তার একটি অভিন্ন মানদণ্ডও তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী। এতে সভাপতিত্ব করেন আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা।