তিন দিনের ব্যবধানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় আরেকটি খুনের ঘটনা ঘটল। দিনদুপুরে কিশোর গ্যাং নেতা ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যার রেশ না কাটতেই গত বুধবার রাতে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামের এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধের জেরে খুন হয়েছিলেন ইমন। আর আসাদুল খুন হলেন তাঁর নিজ দলের কর্মীদের হাতে। তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মাত্র ৩০০ মিটারের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মোহাম্মদপুর–আদাবর থেকে দুই হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বুধবার দিবাগত রাত ১২টার পর আসাদুলকে তাঁর এক বন্ধু রায়েরবাজার সাদেক খান ইটখোলা এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে ওত পেতে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় তাঁর সহযোগীরাই তাঁকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। রক্তাক্ত অবস্থায় রাত পৌনে একটার দিকে আসাদুলকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আসাদুলের পকেট থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। আসাদুল মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিংয়ে থাকতেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কালনায়। বাবার নাম জলিল সরদার।
ঘটনাস্থলের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসি) ফুটেজে দেখা যায়, এক যুবক আসাদুলের কাঁধে হাত দিয়ে একটি গলির শেষ মাথায় নিয়ে যান। মোটরসাইকেলে করে আরেক যুবক এসে তাঁকে চাপাতি নিয়ে কোপান। এ সময় আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন যুবক তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আসাদুলের ওপর হামলা চালান।
খুনের ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানালেন নিহত আসাদুলের মামাতো ভাই রিয়াজ হোসেন। গতকাল রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই যেখানে খুন হয়েছেন, সেখান থেকে তাঁর বাসা ৫০০ গজের মধ্যে। এলেক্স ইমন খুন হওয়ার পর ওই জায়গায় দিনে পুলিশি পাহারা ছিল। কিন্তু রাতে থাকত না। সেখানে পুলিশি পাহারা থাকলে তাঁর ভাই খুন হতেন না।
গতকাল বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, আসাদুল মোহাম্মদপুরে খুচরা মাদকের কারবার করতেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মাদক বিক্রি ও টাকার লেনদেন নিয়ে তাঁদের নিজ দলের মধ্যেই বিরোধ চলছিল। এর জের ধরেই তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চারটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, হামলাকারীদের শনাক্ত করা গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এর আগে গত রোববার বিকেলে রায়েরবাজারে ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক কিশোর গ্যাং নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইমন কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ছিলেন। ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোন নিয়ে কিশোর গ্যাং আরমান-শাহরুখের পক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্বে খুন হন তিনি। ইমন হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ছয় আসামির চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলাম এ আদেশ দেন। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া আসামিরা হলেন সাঈদ হোসেন শিমুল ওরফে আইয়ুশ, মো. তুহিন বিশ্বাস, মো. রাব্বি কাজী, সুমন ওরফে পাখির পোলা সুমন, মো. রানা ও রাসেল ওরফে পিচ্চি রাসেল।
জানতে চাইলে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের যে পক্ষের সদস্যরা আইনের আওতায় আসে, সেই পক্ষের কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে যায়। পরে নতুন নামে আরেকটি পক্ষ মাথাচাড়া দেয়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা মোহাম্মদপুর-আদাবরের গ্যাং কালচারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। এরপরও চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি থামানো যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে এডিসি জুয়েল রানা বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অভিযান চালিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিনের মাথায় তাদের অনেকেই কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। গত বছরের অক্টোবরে মাদকসহ আসাদুলকে (নিহত) গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে তিনি জামিনে বেরিয়ে আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন।