চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা: প্রত্যক্ষদর্শী গাড়িচালকসহ ছয় সাক্ষী মারা গেছেন
চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় সাক্ষীদের হাজির করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। এ মামলায় ৩৮ সাক্ষীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৬ জন মারা গেছেন, ২ জনকে বৈরী ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেও আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না।
প্রায় ২৫ বছর আগের এই মামলায় মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। গত মে মাসের পর কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। মামলাটি হওয়ার প্রায় ২৪ বছর পর গত বছর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেন আইনজ্ঞরা।
১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর বনানীর ট্রাম্প ক্লাবের সামনে সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করেন সন্ত্রাসীরা। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে উঠে আসে আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ট্রাম্প ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম ও আশীষ রায় চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধের জেরে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে সোহেল চৌধুরীকে খুন করা হয়। খুন হওয়ার পরের বছর আশীষ রায় চৌধুরীসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এর দুই বছর পর ২০০১ সালে বিচার শুরুর আদেশ হয়। ওই আদেশ চ্যালঞ্জ করে এক আসামি উচ্চ আদালতে গেলে আটকে যায় বিচার কার্যক্রম। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে আবার বিচার কার্যক্রম গত বছর শুরু হয় বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি।
ব্লাস্টের আইন উপদেষ্টা সাবেক জেলা জজ এস এম রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ফৌজদারি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী যদি মারা যান, যদি আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিতে পারেন কিংবা বৈরী সাক্ষ্য দেন, তাহলে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা রাষ্ট্রপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় যে সাক্ষীরা এখনো বেঁচে আছেন, রাষ্ট্রপক্ষের উচিত তাঁদের দ্রুত আদালতে হাজির করে সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা।
মারাও গেছেন ছয় সাক্ষী
এই মামলার ৩৮ সাক্ষীর মধ্যে সোহেল চৌধুরীর গাড়িচালকসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন সোহেল চৌধুরীর মা নূরজাহান বেগম, গাড়িচালক আবুল কালাম, চৌধুরী মোহাম্মদ ওমর চৌধুরী, এ কে এম তোফাজ্জল হোসেন, নিলুফার বেগম ও পুলিশ পরিদর্শক সিরাজ উল্লাহ মারা গেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) সাদিয়া আফরিন এ তথ্য জানান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে আসেননি, তাঁদের নামে আদালত থেকে সমন জারি করা হয়। পরে আদালতে পুলিশের জমা দেওয়া প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ছয়জন সাক্ষী আগেই মারা গেছেন। বাকিদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এপিপি সাদিয়া আফরিন জানান, সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ছয়জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে বৈরী ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁরা একজন হলেন বনানীর ট্রাম্প ক্লাবের তৎকালীন ব্যবস্থাপক এনামুল হাফিজ খান, অন্যজন রওশন আরা আক্তার।
এদিকে ১৭ বছর আগে ঢাকা মহানগরের পিপি দপ্তর থেকে সোহেল হত্যা মামলার তদন্তের নথিপত্র কেস ডকেট (সিডি) নিয়ে যান পুলিশের তৎকালীন পরিদর্শক ফরিদ উদ্দিন। আদালতের নির্দেশের পরও তিনি সেই সিডি আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি বলে জানান এপিপি সাদিয়া।
মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি পরিচালনা করে আসছে। যাঁরা এখনো সাক্ষ্য দেননি, তাঁদের প্রত্যেককে আদালতে হাজির করা হবে।
কেন এবং কীভাবে খুন হন সোহেল চৌধুরী
মামলার কাগজপত্র ও পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষীদের জবানবন্দির তথ্য বলছে, বনানীর ট্রাম্প ক্লাবে গান বন্ধ করা নিয়ে ১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বান্টি ইসলাম ও বান্টির বন্ধু আশীষ রায় চৌধুরীর সঙ্গে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী বিরোধের শুরু। এর জেরেই ট্রাম্প ক্লাবের সামনে ঢাকার তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় সোহেল চৌধুরীকে।
সেদিন রাতে বনানীর ট্রাম্প ক্লাবে গান বন্ধ করতে বলেছিলেন সোহেল চৌধুরী ও তাঁর বন্ধুরা। এ নিয়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেলের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সোহেল চৌধুরী আজিজের ওপর ক্ষেপে যান। তখন সোহেলের বন্ধু কালা নাসির গুলি করতে যান আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে। এ সময় ক্লাবের শৌচাগারে ঢুকে আত্মরক্ষা করেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। এই ট্রাম্প ক্লাবের মালিকানা ছিল বান্টি ও আশীষের। ট্রাম্প ক্লাবের কার্যক্রম চলত বনানীর আবেদিন টাওয়ারের সপ্তম তলায়। ক্লাবের পশ্চিম পাশে ছিল একটি জামে মসজিদ। জবানবন্দিতে একাধিক সাক্ষী বলেন, ক্লাবে নাচ-গানসহ অসামাজিক কার্যক্রম চলত। অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে স্থানীয় মুসল্লিদের পক্ষে অবস্থান নেন সোহেল।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, সোহেল চৌধুরী মসজিদ কমিটির লোকজন নিয়ে ক্লাব বন্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ট্রাম্প ক্লাবের কাজ ব্যাহত হলে সোহেল চৌধুরীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন আসামিরা। পরে তখনকার ঢাকার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ ওরফে মামুন, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করেন। তখনকার গণমাধ্যমের খবর অনুয়ায়ী, ট্রাম্প ক্লাবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যাতায়াত ছিল।
সোহেল চৌধুরীর মা নূরজাহান বেগম তখন বলেছিলেন, তাঁদের বাসার উল্টো দিকে ট্রাম্প ক্লাব। হত্যাকাণ্ডের দিন রাত দুইটায় সোহেল বাসায় ফেরেন। ক্লাবের সামনে জামে মসজিদ। পরে সোহেল আবার ক্লাবে গেলে সন্ত্রাসীরা তাঁকে দুটি গুলি করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
সোহেলের তৎকালীন গাড়িচালক আবুল কালাম তখন পুলিশকে জানিয়েছিলেন, সোহেলসহ সাত থেকে আটজন লোক ক্লাবের সামনে গেলে হঠাৎ গুলি করেন সন্ত্রাসীরা। গুলি করার পর ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক গাড়িতে করে পালিয়ে যান।
মূল আসামিরা কে কোথায়
আসামিদের মধ্যে আজিজ মোহাম্মদ ভাই অন্যান্য ব্যবসার বাইরে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করতেন। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী খুন হওয়ার দুই বছর আগে রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু হয়। তখন সালমানের মা অভিযোগ করেন, খুনের পেছনে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হাত রয়েছে। সে সময় চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক নানা ঘটনায় তিনি আলোচিত ছিলেন। চার বছর আগে (২০১৯ সালে) রাজধানীর গুলশানের আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি মদ, সিসা উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সোহেল চৌধুরী খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন।
এ ছাড়া গত বছরের ৬ এপ্রিল দেশের মধ্যে পালিয়ে থাকা পলাতক আসামি আশীষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতলকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাঁর গুলশানের বাসা থেকে বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। তিনি একাধিক বেসরকারি এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন পদে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি জিএমজি এয়ারলাইনসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ছিলেন।
কারাগারে আছেন আশীষ রায় চৌধুরী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন। আর জামিনে আছেন আসামি ফারুক আব্বাসী। পলাতক আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও সেলিম খানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ ওরফে মামুন তিন মাস আগে জামিনে ছাড়া পান। ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ বলেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তারিক সাঈদ ওরফে মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ইমন ও মামুনের বিরোধ দেখা দেয়। ওই বিরোধের জেরে খুনের উদ্দেশ্যে মামুনের ওপর হামলা হয়।