সোনারগাঁও–সিদ্ধিরগঞ্জে ‘ছায়া এমপি’র দাপট

  • ‘সুনির্দিষ্ট’ অভিযোগে আটক, পরে মুচলেকায় মুক্তি।

  • অনুমতি ছাড়া দরপত্র জমা দেওয়া যায় না

  • অংশ নেন উপজেলার সমন্বয় সভায়ও।

বাবা সরকার–দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি)। তবে পুরো সংসদীয় এলাকায় প্রভাব ছেলের। এলাকায় দলের রাজনীতি থেকে শুরু করে অবৈধ উপার্জনের খাতগুলোর নিয়ন্ত্রকও ছেলে। শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, উন্নয়নকাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, নৌপথ ও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে একক আধিপত্য গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

যাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ, তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীব। তাঁকে গত রোববার গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আটক করেছিল। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়েও দেওয়া হয়। ‘বেশ কিছু অভিযোগের’ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়ছিল।

‘এমপিপুত্র’ সজীব নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আটকের পর গত রোববার তাঁকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংগঠনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নানা অনিয়মে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

পুলিশ বা সংগঠনের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ ও অনিয়মের কথা প্রকাশ করা হয়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের বড় অংশজুড়ে থাকা শিল্পকারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করেই সজীবকে আটক করা হয়েছে। একাধিক বড় শিল্পের মালিকও প্রথম আলোকে একই অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।

এমপিপুত্রের প্রভাববলয়ের বিষয়ে কয়েক দিন ধরে সরেজমিন ও বিভিন্ন সূত্র থেকে খোঁজখবর করেছেন এই প্রতিবেদকেরা। এ সময় সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, খাইরুল ইসলাম সজীবকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। বাবা এমপি হলেও তিনি সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জে ‘ছায়া এমপি’ হয়ে উঠেছেন। তাঁর আটকের খবরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পরে ছেড়ে দেওয়ায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।

তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, সজীবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি মনে করে তিনি কোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়িত, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।

আরও পড়ুন

এদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগের পরও সজীবকে আটকের পর কেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি জানতে চাওয়া হয় জেলা পুলিশের কাছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, সজীবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে, তবে কেউ লিখিত অভিযোগ বা মামলা করেননি। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কোনো পদে না থাকলেও সজীব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভায় অংশ নেন। এসব সভায় বক্তব্য দেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সব বার্তাও ছেলের মাধ্যমেই স্থানীয় প্রশাসন পেয়ে আসছে।

তবে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা সমন্বয় সভার কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন করা হয়নি। নির্দিষ্ট কমিটি না থাকায় এলাকার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি সভায় উপস্থিত থাকেন। খাইরুল ইসলাম সজীবও তাঁদের মধ্যে একজন হিসেবে সভায় অংশ নেন।

এমপিপুত্রের প্রভাববলয়ের বিষয়ে কয়েক দিন ধরে সরেজমিন ও বিভিন্ন সূত্র থেকে খোঁজখবর করেছেন এই প্রতিবেদকেরা। এ সময় সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।

যেভাবে প্রভাবশালী তাঁরা

স্থানীয় লোকজন জানান, আজহারুল ইসলাম একসময় বালু উত্তোলন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। পরে জমি কেনাবেচার ব্যবসায় এসে বালুর কারবার ছেড়ে দেন। একপর্যায়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হন। বর্তমানে তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি একবার উপজেলা চেয়ারম্যানও হন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন।

বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে আজহারুল ইসলাম স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন এবং অনেককে আর্থিক সহায়তাও করেছেন। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় লোকজন তাঁর পরিবারকে ভিন্ন ভূমিকায় দেখতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন আজহারুলের ছেলে সজীবের অনুসারীরা মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার নিয়ন্ত্রণ নেন। টানা চার দিন পরিবহন থেকে টোলের টাকা তাঁরা আদায় করেন।

আরও পড়ুন

সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সজীবের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। বিভিন্ন কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। পরে বাবা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সজীব আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জে তাঁর অনুসারীদের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে। এতে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীও কোণঠাসা হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত সদস্য (মহিলা মেম্বার) মমতাজ বেগম অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতাপের চর এলাকায় তাঁর চারতলা বাড়িসহ ২৩ শতাংশ জমি দখল করে নেন সজীবের অনুসারীরা। একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বিক্রিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মমতাজ বেগম বলেন, ‘শুধু বাড়ি দখল করেনি, আমাদের একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে। এখন ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। আমার স্বামী তমিজ উদ্দিন এবং দুই ছেলে মাহবুব ও মজিবরের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন আরও কিছু জমি দখলের চেষ্টা চলছে।’

স্থানীয় বিএনপির দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মমতাজ বেগমের বাড়ি দখলের ঘটনাটি নিয়ে তাঁরা বিব্রত। তাঁদের দাবি, ভিন্নমতপোষণকারী ব্যক্তি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা ও নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও হামলার শিকার হয়েছেন বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।

জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ওয়াহিদ বিন ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন। এ নিয়ে আজহারুল ইসলাম ও তাঁর ছেলের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে তাঁকে ডাকাতি ও লুটপাটের মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি একটি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। এলাকায় আমার একটা ইমেজ আছে। অথচ তাঁরা আমাকে ডাকাত বানিয়ে দিল।’

স্থানীয় বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর সজীবের অনুসারীরা সোনারগাঁ উপজেলা কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে মারধর ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটান।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সজীবের ঘনিষ্ঠদের নেতৃত্বে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ সক্রিয়। এ বিষয়ে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। তাঁদের ভাষ্য, সজীবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সোনারগাঁ থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আতাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ওই গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং সালিসের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যৌথ বাহিনী আতাউর রহমানকে আটক করেছিল। তবে আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে আটকের ঘটনা ছিল ভুল-বোঝাবুঝির ফল। তিনি কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন।

সজীবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে গত সোমবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত টানা তিন দিন মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একটি বার্তা পৌঁছালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ ছাড়া সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ গতকাল বেলা ৩টা ৩২ মিনিটে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলে ফোনটি ধরে বলা হয়, ‘এমপি সাহেব মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। সন্ধ্যার পর ফ্রি হবেন।’ সন্ধ্যার পর তাঁর মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে কল এবং একাধিক বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিএনপির কার্যালয় দখল

খাইরুল ইসলাম সজীব ও তাঁর বাবা সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দলীয় অস্বস্তির আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কার্যালয়কে ঘিরে। গত ১০ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী মুন লাইট সিনেমা হলের সামনে জেলা বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। সেখানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদসহ জেলার চার সংসদ সদস্যের ছবি টাঙানো ছিল।

১৮ জুন সকালে সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের অনুসারীরা কার্যালয়টির সাইনবোর্ড খুলে সেখানে ‘মাননীয় সংসদ সদস্য নারায়ণগঞ্জ-৩-এর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়’ লেখা নতুন সাইনবোর্ড টাঙান। একই সঙ্গে অন্য তিন সংসদ সদস্যের ছবি সরিয়ে শুধু আজহারুল ইসলামের ছবি রাখা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা-কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, কার্যালয়টি জেলা বিএনপির নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। সেটিকে একজন ব্যক্তির কার্যালয়ের পরিচয় দেওয়া শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ।

এ ঘটনায় ১৮ জুন প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে আসে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এর দুদিনের মাথায় ২০ জুন ভোরে আবার জেলা বিএনপির পুরোনো সাইনবোর্ড ফিরিয়ে আনা হয় এবং অপসারণ করা তিন সংসদ সদস্যের ছবিও পুনঃস্থাপন করা হয়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, কার্যালয়টি জেলা বিএনপির কার্যালয় হিসেবেই চালু করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেভাবেই থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা-কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, কার্যালয়টি জেলা বিএনপির নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। সেটিকে একজন ব্যক্তির কার্যালয়ের পরিচয় দেওয়া শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ।

শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক প্রভাব ও চাঁদাবাজি

স্থানীয় শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আজহারুল ইসলাম সংসদ সদস্য হওয়ার পর তাঁর ছেলে সজীবের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কাঁচপুর থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পকারখানায় চাপ দিতে থাকেন। টাকার জন্য কোনো কোনো কারখানার পণ্যবাহী ট্রাক আটকে দেওয়ার ঘটনাও আছে।

এ ছাড়া মেঘনা শিল্পনগরী, কাঁচপুর বিসিক শিল্পনগরী এবং আদমজী ইপিজেডসংলগ্ন এলাকায় ঝুট ব্যবসা, কারখানার পরিত্যক্ত মালামাল (ওয়েস্টেজ) বিক্রি, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন সরবরাহকাজকে কেন্দ্র করে কিছু চক্র গড়ে উঠেছে। এমপিপুত্র সজীব এসব চক্রের পৃষ্ঠপোষক বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১০ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা জানান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজিতে সজীবের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) সেলিম হোসেন (দিপু), সোনারগাঁ থানা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মো. জলিল এবং কাঁচপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক বি এম ডালিম।

তবে সেলিম হোসেন ও মো. জলিল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনি কোনো চাঁদাবাজিতে জড়িত নন। এমপিপুত্র সজীবও কোনো চাঁদাবাজি করেন না।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে গিয়ে ঝুট বা পরিবহনসংক্রান্ত কাজ দিতে চাইলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।

আরেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছেন সজীব। তাঁরা প্রথমে চাঁদা দিতে রাজি হননি। পরে হামলা ও হুমকির ভয় দেখিয়ে টাকা নেন তিনি।

স্থানীয় লোকজন জানান, সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার হাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, এই কর্মকাণ্ডের পেছনেও রয়েছে সজীবের প্রভাব।

নদীকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও বালুবাণিজ্য

মেঘনা নদীতে মাছ ধরার নৌকা, বালুবাহী ট্রলার ও বিভিন্ন নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সজীব ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে। এ কাজে একটি সংগঠিত বাহিনীও সক্রিয় বলে স্থানীয়দের দাবি। গত বছরের ২৫ জুন মেঘনা নদীর বিভিন্ন চৌকি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ–পুলিশ।

নৌ–পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার নৌকা, বালুবাহী ট্রলার ও বিভিন্ন নৌযান থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করছিলেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের চাচাতো ভাই ও সোনারগাঁ বিএনপির সদস্য আলী নূর এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য হাসান বশির।

কাঁচপুরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ল্যান্ডিং স্টেশনকে কেন্দ্র করে বালু, পাথর ও বিভিন্ন পণ্যবাহী নৌযানের মালামাল ওঠানামা, খালাস এবং পরিবহন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে সজীবের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় লোকজন জানান, সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার হাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, এই কর্মকাণ্ডের পেছনেও রয়েছে সজীবের প্রভাব।

দরপত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজের দরপত্রেও সজীব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দরপত্র আহ্বানের আগেই কারা কোন কাজ পাবেন, সেটা নির্ধারণ করেন সজীব। সর্বশেষ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে গাড়ি পার্কিং ও শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার দরপত্র কিনেও কোনো ঠিকাদার সেটি জমা দিতে পারেননি। গত রোববার ছিল দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।

বিষয়টি নিয়ে অন্তত তিনজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। এর মধ্যে দুজন বিএনপির পদধারী নেতা। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এমপিপুত্র সজীবের অনুমতি ছাড়া এখানে দরপত্র জমা দেওয়া যাবে না। কে দরপত্র জমা দেবেন, সেটি তিনি নির্ধারণ করবেন। কিন্তু গত রোববার তাঁকে পুলিশ আটক করায় এ বিষয়ে আর সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কেউ আর দরপত্র জমা দেননি।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ৫০টির বেশি দরপত্র বিক্রি হয়েছিল। তবে নির্ধারিত তারিখে কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। কেন কেউ জমা দেননি, সেটাও তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।

বিষয়টি নিয়ে অন্তত তিনজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। এর মধ্যে দুজন বিএনপির পদধারী নেতা। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এমপিপুত্র সজীবের অনুমতি ছাড়া এখানে দরপত্র জমা দেওয়া যাবে না। কে দরপত্র জমা দেবেন, সেটি তিনি নির্ধারণ করবেন।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ স্থানীয়দের

স্থানীয় বিএনপি নেতা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রশাসনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জে সজীবের প্রভাব এখন বিএনপির রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন, শিল্পাঞ্চল, নৌপথ ও স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

সোনারগাঁয়ের সাংস্কৃতিক কর্মী শাহেদ কায়েস প্রথম আলোকে বলেন, সোনারগাঁ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ অঞ্চলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর পড়বে। তিনি বলেন, যাঁদের কর্মকাণ্ডে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।