ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, জসিম মোটরসাইকেল চুরিতে সিদ্ধহস্ত। মাত্র পাঁচ মিনিটে বাসার মূল ফটকের তালা ভেঙে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত অনেকের নাম পাওয়া গেছে।

জসিমের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচরে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ২০১০ সালে ঢাকায় আসেন। মিরপুর ও খিলগাঁও এলাকায় প্রায় তিন বছর তিনি পোশাক ধোয়া ও ইস্ত্রি করার দোকানে (লন্ড্রি) কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী (ভায়রা) শাহ আলমের প্ররোচনায় মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। জসিম ও শাহ আলম শুরুতে আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে চুরি করতেন। পরে নিজেই শাহ আলমকে সঙ্গে নিয়ে নতুন দল গঠন করেন। তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন মো. হারুন (২৮), আশিক বিশ্বাস (১৯), রাজীব (২০) ও মহসীন (২০)—যাঁদের পুলিশ গত সোমবার গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ জানায়, জসিম ১০ বছরে তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি চুরির টাকায় শ্বশুরবাড়ি টাঙ্গাইলের সখীপুরে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করে একটি বাড়ি করেন। পুলিশ সেই বাড়ি থেকে একবার তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২১ সালে মাত্র ছয় লাখ টাকায় বাড়িটি বিক্রি করে দেন তিনি।

মোটরসাইকেলের বিক্রি ও ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি চুরির ঘটনাও বাড়ছে। চোরদের শাস্তি নিশ্চিত হলে চুরি কমে যেত।
শুভ্র সেন, মোটরসাইকেলবিষয়ক ওয়েবসাইট বাইক বিডি ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)

জসিমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মিরপুর থানার পুলিশ জানায়, ঢাকায় যাঁরা মোটরসাইকেল চুরি করেন, তাঁদের বেশির ভাগ এ কাজে জড়িয়েছেন আবুল কালাম আজাদের হাত ধরে। তিনি চোরদের গুরু। বাড়ি বরিশালে। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৪৯টি মামলা রয়েছে। আবুল কালাম এখন যাত্রাবাড়ী এলাকায় মোটরসাইকেল চুরি করেন। তাঁর চক্রে রয়েছেন চার ব্যক্তি, যাঁদের দুজনের নাম সোহাগ, অন্য দুজন রাশেদ ও রাসেল। যাঁরা আবুল কালাম আজাদের অধীনে কাজ করতেন, তাঁদের অনেকেই পরে নতুন চক্র গঠন করেন।

চোর চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে চুরি করেন। পুলিশ জানায়, খিলগাঁও ও আশপাশের এলাকায় মিরাজ, আশিক ও মশিউর; উত্তরায় মিজান ও জসিম; মিরপুরে জসিমের দলের বাইরে রহিম, নূরা, রামেন ও মামুন এবং মোহাম্মদপুরে ভাসানী, বাবু ও রুবেল মোটরসাইকেল চুরিতে জড়িত। উত্তরা ও মোহাম্মদপুরের দল দুটির নেতৃত্ব দেন আবুল কালাম আজাদ।

চোরাই মোটরসাইকেল কোথায় যায়

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকা থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেলগুলো পাঁচ জেলায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন চোর চক্রের সদস্যরা। এগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর ও কুমিল্লা। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পলাশ, নোয়াখালীতে রাজন, চাঁদপুরে রুবেল এবং মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় ফারুক নামের এক ব্যক্তি চোরাই মোটরসাইকেল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। কুমিল্লার লাকসামে চোরাই মোটরসাইকেল এক ব্যক্তি কেনাবেচা করেন। তবে তাঁর নাম জানা যায়নি।

পুলিশ সূত্র জানায়, চোররা সব সময় দামি মোটরসাইকেলকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। চার লাখ টাকার একটি মোটরসাইকেল তারা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সহকারী কমিশনার হাসান মুহাম্মদ মুহতারিম প্রথম আলোকে বলেন, চোরাই মোটরসাইকেল সাধারণত গ্রামাঞ্চলে চলে।

জসিমকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জেনেছে, চোররা মূলত নিরাপত্তার ঘাটতি থাকা বাসা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে। বিশেষ ধরনের তালা থাকলে সেদিকে নজর দেয় না তারা।

মোটরসাইকেলবিষয়ক ওয়েবসাইট বাইক বিডি ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শুভ্র সেন প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেলের বিক্রি ও ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি চুরির ঘটনাও বাড়ছে। চোরদের শাস্তি নিশ্চিত হলে চুরি কমে যেত।