ভাড়া দেওয়ার সময় যাত্রীর টাকায় নজর, বাসেই শ্বাসরোধে হত্যা

পুলিশ বলছে, এই বাসের যাত্রী ছিলেন ইসমাইল হোসেনছবি: কোলাজ

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ইসমাইল হোসেন (৪৯) নামের ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর পুলিশ বলছে, তারা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছে।

পুলিশের ভাষ্য, বাসভাড়া চাওয়ার সময় লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করেছিলেন যাত্রী ইসমাইল। তাঁর কাছে আরও টাকা থাকার ব্যাপারটি তখন নজরে পড়ে বাসের সুপারভাইজারের। তিনি বিষয়টি জানান বাসচালককে। এরপর ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন তাঁরা। বাসের অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে তাঁরা ইসমাইলকে আটকে রেখে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তাঁর মরদেহ ফেলে রাখেন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে।

আজ রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে বনানী থানা-পুলিশ।

এ ঘটনায় বাসচালকসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং সহকারী (হেলপার) মো. মনির হোসেন (১৯)। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তাঁদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত দুটি গামছা, রক্তমাখা দুটি আসনের কভার ও একটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাসটিও জব্দ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে নয়টার দিকে লাশটি পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে বনানী থানা-পুলিশ। তাঁর মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল। গলায় কালো দাগ দেখা যায়। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।

ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, যে ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়, তাঁর পরিচয় তথ্যপ্রযুক্তি ও হাতের আঙুলের ছাপের (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা থানায় আসেন। মরদেহের ছবি দেখে তাঁরা তাঁকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বনানী থানায় মামলা করেন।

রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। আজ রোববার
ছবি: ডিএমপির সৌজন্যে

ফারুক হোসেন বলেন, তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ইসমাইল তাঁর বাড়ি জামালপুর থেকে বাসে করে গাজীপুরে আসছিলেন। জমি বিক্রির প্রায় পাঁচ লাখ টাকা তাঁর সঙ্গে ছিল। তাঁর ছেলে গাজীপুরে বাবার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তিনি ইসমাইলের মুঠোফোন বন্ধ পান। লাশ উদ্ধারের পর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ। ফুটেজ বিশ্লেষণে একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটি শনাক্ত করে জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের বাসটি জব্দ করা হয়। একই সময় বাসের সুপারভাইজার সাজু ও সহকারী মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার হন বাসচালক সোহেল।

গ্রেপ্তারের পর তিন আসামিকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানান ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ঘটনার বিবরণে তাঁরা বলেছেন, ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে চারটার দিকে জামালপুর থেকে ইসমাইল বাসে ওঠেন। একপর্যায়ে ইসমাইলের কাছে ভাড়া চান সুপারভাইজার সাজু। ইসমাইল তাঁর লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখন সাজুর ধারণা হয়, ইসমাইলের কাছে অনেক টাকা আছে। তিনি বিষয়টি বাসচালক সোহেলকে জানান। সোহেলেরও একই ধারণা হয়। এরপর তাঁরা ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাঁরা ইসমাইলকে গাজীপুরে নামাননি। তবে অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে দেন। পরে সাজু ও সহকারী মনির মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তাঁর নাক-মুখও স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেন। গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ইসমাইলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে ইসমাইলের মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলেন। পরে বাস নিয়ে তাঁরা মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যান।

আরও পড়ুন

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাজুর বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতির মামলা এবং সোহেলের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি ও দুটি মাদক মামলা আছে। সোহেলের বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে।

আরও পড়ুন