রাজীব হোসেনের হাড়গোড় উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পিবিআইয়ের যশোর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) রেশমা সুলতানা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, হাড়গোড় উদ্ধারের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার করার খবর জানাজানি হওয়ার পর আরেকটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে সজীবুর রহমান যশোরের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি এখন কারাগারে।

পুলিশের ভাষ্য, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আবদুস সালাম বলেন, সজীবুরের নির্দেশ ও পরিকল্পনায় ছয়-সাতজন মিলে রাজীবকে শ্বাসরোধ করেন। এরপর রাজীবের লাশ একটি ড্রামে ঢোকানো হয়। ড্রামটি নিজের রিকশায় করে নিয়ে তিনি নিরিবিলি পাড়ার একটি শৌচাগারের পাটাতনের নিচে ফেলে দেন।

পিবিআই সূত্র জানায়, রাজীবের বাড়ি খুলনায় দীঘলিয়ার চন্দনীমহলে। যশোরের কোতোয়ালি থানাধীন নিরিবিলি পাড়ায় রাজীবের চাচা হাসমত আলীর চায়ের দোকান। দোকানের কাছেই সজীবুরের ক্লাব। রাজীব ওই ক্লাবের কর্মচারী ছিলেন।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ রাতে রাজীব তাঁর বাবা ফারুক হোসেনকে মুঠোফোনে বলেন, তিনি খুলনায় তাঁদের বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু খুলনার বাড়িতে না গেলে রাজীবের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পান তিনি।

এরপর ফারুক হোসেন তাঁর ভাই হাসমতের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তিনিও রাজীবকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এর কয়েক দিন পর পরিবারের সদস্যরা রাজীবের সন্ধানে যশোরে সজীবুরের বাসায় যান। তাঁর কাছে রাজীবের সন্ধান চাইলে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। রাজীবের খোঁজ পেতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মামলাও করতে বলেন সজীবুর। ছেলের খোঁজ না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান রাজীবের মা মাবিয়া বেগম। এরপর থেকে রাজীবের ফেরার অপেক্ষায় ছিল তাঁর পরিবার।

রাজীবের বাবা ভ্যানচালক ফারুক হোসেন শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন অপেক্ষায় ছিলাম ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু একমাত্র ছেলের হত্যার খবর জানার পর থেকে তাঁর মা সারাক্ষণই কাঁদতে কাঁদতে এখন শয্যাশায়ী। বড় ভাইয়ের জন্য কান্না করতে করতে রাজীবের ছোটবোন মাঝে–মধ্যে জ্ঞান হারাচ্ছে।’

পিবিআই কর্মকর্তারা বলেন, গত বছরের ৩০ মে হাসমত আলী মুঠোফোনে ভাই ফারুককে নিরিবিলি পাড়ায় একটি বাড়ির শৌচাগারের পাটাতনের নিচে একটি প্লাস্টিকের ড্রামে মানুষের হাড়গোড় ও খুলি পাওয়ার কথা জানান। এ ঘটনায় ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ফারুক যশোরের পিবিআই জেলা কার্যালয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে উদ্ধার হওয়া হাড়গোড় কার, তা  শনাক্তের জন্য অনুরোধ করেন। এরপর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে পিবিআই।

জিডির সূত্র ধরে পিবিআই আদালতের অনুমতি নিয়ে ফারুক ও তাঁর স্ত্রী মাবিয়া বেগমের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে। এরপর নমুনা ও উদ্ধার হওয়া হাড়গোড় পরীক্ষার জন্য রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় উদ্ধার করা হাড়গোড়ের সঙ্গে ফারুক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর ডিএনএর মিল পাওয়া যায়। এতে করে উদ্ধার হাড়গোড় রাজীবের ও ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হয় পিবিআই।

রাজীব হত্যায় জড়িত সন্দেহে ১৬ জানুয়ারি রিকশাচালক সালামকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পিবিআই। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, রাজীব হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী সজীবুর। হত্যায় সহযোগী হিসেবে ইব্রাহিম ও জয়নাল আবেদিন ছাড়াও আরও দুই তিনজনের নামও উল্লেখ করেন তিনি। পরদিন ১৭ জানুয়ারি রাজীবের বাবা ফারুক হোসেন বাদী হয়ে যুবলীগ নেতা সজীবুর ও আরও ছয়-সাতজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন।

এর পরদিন পিবিআই হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ইব্রাহিম ও জয়নালকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের যশোর আদালতে তুলে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পিবিআই। আদালত শুনানির দিন ধার্য রেখে তাঁদের কারাগারে পাঠিয়েছেন। এদিকে কারাগারে থাকা সজীবুর রহমানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আদালত ২৩ জানুয়ারি তাঁর রিমান্ডের আবেদন নিয়ে শুনানির দিন ধার্য রেখেছেন।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা রেশমা সুলতানা বলেন, ‘হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সজীবুরের রিমান্ড পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।’

নিহত রাজীবের বাবা ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ মানুষ। এ বয়সে ভ্যান চালিয়ে অনেক কষ্টে চার সদস্যের পরিবার চালাচ্ছি। স্বপ্ন ছিল, ছেলে অভাব-অনটনের সংসারে আমাকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।’ তিনি ছেলে রাজীবের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।