ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সংস্থাটি বলছে, অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে পুলিশ সদস্য আলতাব হোসেন হামলাকারীদের ‘টার্গেট’ ছিলেন না।
আজ সোমবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এ কথা বলেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে কোনো টার্গেট ছিলেন না। কারণ, আলতাব হোসেন এসবিতে চাকরি করেন বা করতেন এবং তিনি সেই সময় সিভিল পোশাকে ছিলেন।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, একজন বৃদ্ধ মানুষকে যখন আঘাত করা হচ্ছিল, তখন আলতাব হোসেন পুলিশ সদস্য হিসেবে এবং একজন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব মনে করে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি ‘নিতান্তই বিচ্ছিন্ন’।
গত শনিবার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় একটি গেঞ্জি কারখানায় ঢুকে এসআই আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামকে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আলতাব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। পরে হামলার ‘মূল হোতা’ প্রাইভেট কারচালক জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় পুলিশ।
র্যাব জানায়, রোববার রাতে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে র্যাব-১০ চারজন এবং আমিনবাজার থেকে র্যাব-৪ আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে। মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আলাউদ্দিন, আপন, জিহাদ ও ইমরান। আমিনবাজার থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নূর মোহাম্মদ রুদ্র, রাকিব মিয়া, ছাব্বির আহম্মেদ ও ওয়াসিম।
র্যাব-১০-এর অধিনায়ক বলেন, ‘চারজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হই এবং চারজনকেই বিভিন্নভাবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা আমরা পেয়েছি।’ একই ঘটনায় র্যাব-৪ আরও চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। এ নিয়ে এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে র্যাব ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
যেভাবে হামলা
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে একটি অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে গ্যারেজের মালিককে মারধর করা হচ্ছিল। এ সময় এসআই আলতাব হোসেন প্রতিবাদ করেন। প্রাইভেট কারে থাকা পাঁচজন গ্যারেজমালিকের ওপর হামলা করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়।
এ সময় গ্যারেজের মালিককে মারধরকারীদের সঙ্গে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আলতাব হোসেন নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
প্রাণ বাঁচাতে আলতাব হোসেন দৌড়ে তাঁর ছেলের পোশাক কারখানার ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা সেখানেও যায়। পরে আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে এনে কারখানার গেট ভেঙে তারা ভেতরে ঢোকে। দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলকে মারধর করা হয়। কারখানার মেশিন ও আসবাবও ভাঙচুর করা হয়।
‘কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত’
র্যাবের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আপন ও জিহাদ অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ। বেশ কিছুদিন ধরে তাঁদের পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড খারাপ। তাঁরা ওই অঞ্চলের কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দেন এবং মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, হামলাকারীদের বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে জড়িত বলে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন।
র্যাবের ভাষ্য, আলতাব হোসেনের ওপর আঘাত করেন আলাউদ্দিন। জিহাদ চাকু দিয়ে তাঁকে আঘাত করে জখম করেন। আপনকে ওই এলাকার গ্যাংয়ের মূল হোতা বলা যায়। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি এসএস পাইপ দিয়ে আলতাব হোসেনের মাথায় আঘাত করেন। ইমরানও গণপিটুনিতে অংশ নেন।
রিমান্ড চেয়ে আবেদন
আলতাব হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আজ দুপুরে গ্রেপ্তার জহুরুলকে আদালতে পাঠানো হয়।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি জহুরুলকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার অন্য আসামিদের ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি নিরীহ কেউ যেন হয়রানির স্বীকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে।