ওসমান হাদি হত্যায় আসামিদের কার কী ভূমিকা, অভিযোগপত্রে যা বলল ডিবি

ব্যাটারিচালিত রিকশায় বসা শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করেন মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি। ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কেছবি: সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত শেষে যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কার কী ভূমিকা, তা জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তবে হত্যার নির্দেশদাতা ও সরাসরি জড়িত দুজনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি
ছবি: ওসমান হাদির ফেসবুক পেজ থেকে

ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, আসামিদের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী)। ওসমান হাদিকে সরাসরি গুলি করেন ফয়সাল করিম এবং তাঁকে সহযোগিতা করেন আলমগীর হোসেন। এই তিনজনই ভারতে পালিয়ে গেছেন। ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১) তাঁদের বাসায় ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র সংরক্ষণ করেন। ফয়সালসহ অন্য আসামিদের সীমান্ত পারাপারে সাহায্য করার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ফিলিপ স্নাল (৩২)।

ওসমান হাদির হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ
ছবি: ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট

গ্রেপ্তার ১২ জনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২) ও সঞ্জয় চিসিম (২৩) হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। ফয়সাল করিমের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও নরসিংদীতে অস্ত্র স্থানান্তরের কাজে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল করিমের মা হাসি বেগমের (৬০) বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তারের (৪২) বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি ফয়সালকে বাসায় আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র সংরক্ষণ করে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেন।

ফয়সল করিমের শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া ও বান্ধবী মারিয়া আক্তার
ফাইল ছবি

ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়ার (২৪) বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্বামীকে পালিয়ে যাওয়ার খরচ বাবদ বিকাশে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। আর ফয়সালের শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু (২৭) ঢাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সংগ্রহ করে নরসিংদীতে নিয়ে যান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ। বলা হয়েছে, ওয়াহিদ সেই অস্ত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (২৫) নামের এক ব্যক্তির কাছে রেখেছিলেন।

ফয়সালের বন্ধু মো. কবির (৩৩) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এতে বলা হয়েছে, ফয়সাল ও আলমগীরের বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১) হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এই হত্যায় আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশের তদন্তে এসেছে।

ফয়সাল করিমের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম
ছবি: র‌্যাবের সৌজন্যে

ডিবি জানায়, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য–উপাত্ত পর্যালোচনা করে যাঁদের বিষয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাঁদের অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে ও নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেই রাজনীতির কারণেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামি ও গুলিবর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও তাঁর সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। তবে এই তিনজনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে ডিবি।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা–৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি বেশ কিছু দিন ধরে গণসংযোগ করে আসছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাঁকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।