পুলিশের সেই উপকমিশনার কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তের আদেশ বাতিল

কোহিনূর মিয়া

দেড় দশক আগে পুলিশের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মো. কোহিনূর মিয়াকে অপসারণের সময়কালকে চাকরি হিসেবে ধরে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পশ্চিম অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) কোহিনূর মিয়াকে ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আজ সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে কোহিনূর মিয়াকে বরখাস্তের ওই আদেশ বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দুটি বিভাগীয় মামলায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই অভিযোগে দায়ের করা দুটি ফৌজদারি মামলায় বিজ্ঞ আদালত তাঁকে নির্দোষ গণ্য করে মামলার দায় থেকে খালাস দেন। তাঁর গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতাদি এবং অন্যান্য সুবিধাদি পাবেন।

এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কে এই কোহিনূর মিয়া

বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চার–দলীয় জোট সরকারের আমলে কোহিনূর মিয়া তৎকালীন সরকারের আস্থাভাজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আর এ কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাঁকে কোণঠাসা করে। একপর্যায়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বিসিএস ১২তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায়।

২০০৬ সালের ১২ মার্চ ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে শাহিন সুলতানা শান্তা নামের এক নারী পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সেদিন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ ও দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সময় নিজের ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে শান্তা ভয়ে পাশের একটি ক্লিনিকে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সদস্যরা তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।

ঘটনার দুই দিন পর ২০০৬ সালের ১৪ মার্চ শান্তা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার কোহিনূর মিয়া ও এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেয়। এতে আপত্তি জানিয়ে শান্তা বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০০৯ সালে মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন আদালত। তবে মামলার অভিযোগপত্র জমা দিতে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় লাগে এবং ২০২৩ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সম্প্রতি তিনজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিলেও তাঁরা ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। এরপরই আদালত কোহিনূরসহ তিনজনকে খালাস দেন।

২০০৪ সালের ৫ মে পৌরসভা নির্বাচনের সময় ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুজন ও আবু তাহের নামে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় শুরুতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও তদন্তে আসামি শনাক্ত না হওয়ায় একাধিকবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

পরে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া ওই ঘটনায় সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরী, ময়মনসিংহের তৎকালীন পুলিশ সুপার কোহিনূর মিয়া ও পৌর মেয়র আবদুস ছাত্তার ভূঁইয়া উজ্জ্বলসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ২০১১ সালে কোহিনূর মিয়া ও উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেন।