ওরা চাঁদা তোলে, অন্যরা প্রশ্রয় দেয়

ডিএমপির তালিকা ও প্রথম আলোর অনুসন্ধানের পর ‘ মিলেমিশে চাঁদাবাজি মিরপুরে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন গতকাল বুধবার প্রকাশিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে তুলে ধরা হলো পুরান ঢাকা, পল্টন, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজির চিত্র।

কড়াইল বস্তিফাইল ছবি: প্রথম আলো
  • তালিকা করে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।

  • ছয় দিনে গ্রেপ্তার ১২৬ ‘চাঁদাবাজ’ ও ২১৭ ‘সহযোগী’।

রাজধানীর মহাখালী থেকে গুলশান যেতে হাতের বাঁ দিকে কড়াইল বস্তি। বস্তির পথে সড়কে শখানেক অবৈধ দোকান। বস্তিটিতে ঘর আছে সাত হাজারের বেশি।

কড়াইল বস্তিকেন্দ্রিক অবৈধ দোকান, ঘরভাড়া ও সেবা–সংযোগ এবং নৌকার ঘাট থেকে মাসে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয় বলে পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তালিকায় চাঁদা তোলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে নাম এসেছে কড়াইল বস্তি ইউনিট বিএনপির সদস্য মো. সাজিদ মিয়া, মো. হানিফ মিয়া; স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য মো. বাদল মিয়া, মেহেদী হাসান মিশু ও মোহাম্মদ আলীর।

অন্যদিকে তাঁদের আশ্রয়দাতা হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি–সমর্থিত সাবেক কমিশনার আবদুল আলিম (নকি) এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য আবুল কালাম আজাদের।

অবশ্য পুলিশের তালিকাটি প্রথম আলোর হাতে আছে এবং তাতে এই দুজনের নাম রয়েছে। গত মার্চে রাজধানীতে চাঁদাবাজির স্পট (জায়গা) ও চাঁদাবাজদের এই তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। থানা-পুলিশ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিট মিলে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আবদুল আলিমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তালিকায় তাঁর নাম দিয়েছে। তবে তিনি এও বলেন, মহাখালী এলাকায় বড় বড় চাঁদাবাজি হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কারণে দলের বদনাম হচ্ছে।

আবুল কালাম আজাদ আরও দাবি করেন, তালিকায় নাম আসার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ও আবদুল আলিম বনানী থানায় গিয়েছিলেন। পুলিশ তালিকায় তাঁদের নাম দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

আরও পড়ুন

অবশ্য পুলিশের তালিকাটি প্রথম আলোর হাতে আছে এবং তাতে এই দুজনের নাম রয়েছে। গত মার্চে রাজধানীতে চাঁদাবাজির স্পট (জায়গা) ও চাঁদাবাজদের এই তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। থানা-পুলিশ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিট মিলে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

ডিএমপির তালিকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হিসেবে ১ হাজার ২৮০ জনের নাম রয়েছে। আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে নাম উল্লেখ আছে ৩১৪ জনের। এই তালিকা ও প্রথম আলোর অনুসন্ধানের পর ‘ঢাকার চাঁদাবাজেরা ১: মিলেমিশে চাঁদাবাজি মিরপুরে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন গতকাল বুধবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে তুলে ধরা হলো পুরান ঢাকা, পল্টন, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজির চিত্র।

এসব চাঁদাবাজি আওয়ামী লীগ আমলেও হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে। এখন নাম বেশি আসছে বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীদের। অবশ্য বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উচ্চপর্যায়ের সংকেতে চাঁদাবাজের তালিকা করে অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি। ১ মে শুরু হওয়া অভিযানে ছয় দিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তালিকাভুক্ত ১২৬ ‘চাঁদাবাজ’ ও তাঁদের ২১৭ ‘সহযোগীকে’।

পুলিশের তালিকা বলছে, পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে বাবুবাজার সেতু এবং সেতু থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত ১৭০-১৮০টি অবৈধ দোকান রয়েছে। দোকানভেদে দৈনিক ২০০ থেকে ৭০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। ওই সব এলাকায় রাস্তায় রাখা ট্রাক থেকে চাঁদা তোলা হয় দিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে। চাঁদা তোলেন তাইজু ওরফে গোল তাইজু, সাইদ, রিচার্ড ভূঁইয়া ও সুমন পারভেজ। তাঁদের আশ্রয়দাতা ইসহাক সরকার।

পুরান ঢাকা

বাবুবাজার সেতুর নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ইজারা নিয়ে বসানো হয়েছে দোকানপাট
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

পুলিশের তালিকায় নাম রয়েছে যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে গত ২৪ এপ্রিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন। ইসহাক সরকার প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে তিনি ও তাঁর কর্মী বাহিনী জড়িত নয়। হেয় করতে তাঁর নাম তালিকায় দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের তালিকা বলছে, পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে বাবুবাজার সেতু এবং সেতু থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত ১৭০-১৮০টি অবৈধ দোকান রয়েছে। দোকানভেদে দৈনিক ২০০ থেকে ৭০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। ওই সব এলাকায় রাস্তায় রাখা ট্রাক থেকে চাঁদা তোলা হয় দিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে। চাঁদা তোলেন তাইজু ওরফে গোল তাইজু, সাইদ, রিচার্ড ভূঁইয়া ও সুমন পারভেজ। তাঁদের আশ্রয়দাতা ইসহাক সরকার।

পুলিশের তালিকা আরও বলছে, পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাট থেকে বাগানবাড়ি পর্যন্ত সড়কে রাখা ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন মো. হুমায়ুন নামের এক ব্যক্তি। চাঁদার ভাগ পান ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) আবদুস সবুর। যদিও তিনি প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাদামতলীর ফলের আড়তে ফল নিয়ে প্রতিদিন কয়েক শ ট্রাক আসে। রাস্তায় থামিয়ে সেসব ট্রাক থেকে আড়তে ফল নামানো হয়। আবার সেখান থেকে ফল নিয়ে জেলায় জেলায় যায় ট্রাক।

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার নলগোলা এলাকায় প্রায় ২০০টি পুরোনো লোহালক্কর, তথা ভাঙারির দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এসব ভাঙারির দোকান থেকে চাঁদা তোলেন ফয়সাল নামের এক ব্যক্তি। তাঁকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. নাহিদ। এই টাকার ভাগ নেন চকবাজার থানার ওসি (নাম উল্লেখ নেই) ও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল খায়ের।

বাদামতলীর একজন ফল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখন ট্রাকপ্রতি দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। তিনি বলেন, ফুটপাতের দোকানগুলোর কারণে পুরান ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় যানজট লেগে থাকে। পুলিশ ফুটপাত দখলমুক্ত করে না। কারণ, তারাও চাঁদার ভাগ পায়।

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার নলগোলা এলাকায় প্রায় ২০০টি পুরোনো লোহালক্কর, তথা ভাঙারির দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এসব ভাঙারির দোকান থেকে চাঁদা তোলেন ফয়সাল নামের এক ব্যক্তি। তাঁকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. নাহিদ। এই টাকার ভাগ নেন চকবাজার থানার ওসি (নাম উল্লেখ নেই) ও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল খায়ের।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে সম্ভব হয়নি।

এদিকে চকবাজার থানায় চার মাস ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে রয়েছেন আবদুল্লাহ আলম মামুন। ওসি পদে থাকা ব্যক্তিদের চাঁদার টাকার ভাগ নেওয়ার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তবে পরিদর্শক আবুল খায়ের তাঁর সম্পর্কে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, কাপ্তান বাজারের দোকান ও বাজারে আসা ট্রাক থেকে চাঁদা তোলেন মো. রাজ্জাক, এমদাদ, আবদুর রহমান, আক্তার, সুমন, হায়দার ও রাসেল। তাঁদের প্রশ্রয়দাতা বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিয়াজ মোরশেদ জুম্মন মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা চাঁদা তোলেন, তাঁদের তিনি চেনেন না। কোনো চাঁদাবাজকে তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দেন না।

খিলক্ষেত রেলগেট এলাকার ফুটপাত ও অস্থায়ী কাঁচাবাজার থেকে মাসে লাখ টাকা চাঁদা তোলেন রাসেল হোসেন, সাদ্দাম হোসেন ও হাসেম আলী। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, তাঁদের আশ্রয়দাতা খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খোকনসহ থানা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের চার নেতা।

খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ

খিলক্ষেতে রেললাইনের পাশের এই জায়গায় প্রতিদিন বসে কাঁচাবাজার
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

খিলক্ষেত রেলগেট এলাকার ফুটপাত ও অস্থায়ী কাঁচাবাজার থেকে মাসে লাখ টাকা চাঁদা তোলেন রাসেল হোসেন, সাদ্দাম হোসেন ও হাসেম আলী। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, তাঁদের আশ্রয়দাতা খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খোকনসহ থানা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের চার নেতা। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলামের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও জুরাইন এলাকায় এলাকায় মূল সড়কে অবৈধ বাস ও ট্রাক পার্কিং, লেগুনাস্ট্যান্ড, বাস কাউন্টার ও আড়ত থেকে চাঁদা তোলে বিএনপি ও এর অঙ্গ–সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তাঁদের আশ্রয়দাতার তালিকায় নাম রয়েছে ঢাকা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের বড় ছেলে মো. রাসেলের। তবে রাসেল প্রথম আলোকে বলেন, কোনো চাঁদাবাজকে তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন না।

পুলিশের তালিকায় আরও বলা হয়েছে, জুরাইন এলাকায় সরকারি জমি দখল করে গাড়ি পার্কিং বসিয়ে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা চাঁদা তোলেন সাবেক কমিশনার শাহাদত শিকদারের ছেলে শুভ শিকদার।

বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাতে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেন—এমন অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই দলের নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীরা টাকা তুলত। এখন টাকা তোলেন বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী এবং পেশাদার সন্ত্রাসীরা।

চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি

চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজধানীতে প্রায়ই গোলাগুলি, হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটে। যেমন মোহাম্মদপুরে গত ১৬ এপ্রিল দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ইমন হোসেন ওরফে ‘অ্যালেক্স ইমন’ নামের এক ‘কিশোর গ্যাং’ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, ফুটপাতের চাঁদাবাজি, দখল ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের হামলায় খুন হন ইমন। পুলিশের তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে এই অ্যালেক্স ইমনের নাম রয়েছে।

এর আগে মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে’ কেন্দ্র করে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। খুন হন নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবক।

তেজতুরী বাজার এলাকার গলিতে ঢুকছেন মোছাব্বির। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়
ছবি: ডিবির সৌজন্যে

কারওয়ান বাজারের তেজতুরী বাজার এলাকায় গত ৭ জানুয়ারি গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে। তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র বলছে, কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে গত মার্চ মাসে যুবদলের নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের সূত্র জানায়, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদেশে থাকা সন্ত্রাসীদের নির্দেশ হত্যা করা হয় কিবরিয়াকে।

সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশান–১ এর পুলিশ প্লাজার সামনে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা
ছবি: সংগৃহীত

গুলশান ও কড়াইল বস্তি এলাকায় ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুলশানে পুলিশ প্লাজার সামনের সড়কে গত বছরের মার্চে গুলি করে হত্যা করা হয় সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে (৩৩)। গুলশান ও বাড্ডা এলাকার ‘চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে গত বছরের মে মাসে বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় কামরুল আহসান সাধনকে। কামরুল গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় গত বছরের জুলাই মাসে প্রকাশ্যে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

বিমানবন্দর এলাকা

রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে হজ ক্যাম্প এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় ফুটপাতে প্রায় ২০০ দোকান ও দূরপাল্লার বাস কাউন্টার রয়েছে। এসব দোকান ও বাস কাউন্টার থেকে আগে চাঁদা তুলতেন শ্রমিক লীগের সাবেক নেতা খায়রুল ইসলাম খায়ের। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খায়রুল আত্মগোপনে চলে গেছেন। যদিও চাঁদাবাজি থেমে নেই। কেবল হাতবদল হয়েছে।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, হজ ক্যাম্প এলাকায় চাঁদা তোলেন বিএনপির ১৩ নেতা-কর্মী। চাঁদার টাকা তোলার এই তালিকায় বিমানবন্দর থানা শ্রমিক লীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুর নামও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ফেলেছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এখন দেলোয়ার হোসেন বিমানবন্দর থানা শ্রমিক দলের কর্মী বলে পরিচয় দেন।

দেলোয়ারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে ঢাকা ও টাঙ্গাইলে চারটি মামলা রয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরের একাধিকবার কল করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

বিমানবন্দর রেলস্টেশন, হজ ক্যাম্পের সামনের সড়ক ও মুক্তিযোদ্ধা কাঁচাবাজার এলাকার ফুটপাতের দোকান থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা তোলা হয়। এ ছাড়া বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে প্রতি বাতিতে ৫০ টাকা নেওয়া হয়। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, উত্তরা এলাকা থেকে প্রতি মাসে প্রায় তিন কোটি টাকা চাঁদা ওঠে।

বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাতে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেন—এমন অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই দলের নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীরা টাকা তুলত। এখন টাকা তোলেন বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী এবং পেশাদার সন্ত্রাসীরা।

পুলিশের তালিকায় দক্ষিণখান থানা বিএনপির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি খোরশেদ আলম এবং শাকিল নামের এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। খোরশেদের বিরুদ্ধে ঢাকার বিমানবন্দর ও দক্ষিণখান থানায় চাঁদাবাজি ও মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ আইনে তিনটি মামলা রয়েছে।

আশ্রয়দাতা হিসেবে নাম রয়েছে দক্ষিণখান থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে খোরশেদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তালিকায় আশ্রয়দাতা হিসেবে নিজের নাম থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর এখন দলীয় কোনো পদ নেই। তাই কাউকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

এদিকে হজ ক্যাম্প এলাকার ফুটপাতের এক ডিম ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ফুটপাতে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত মাসে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। পরে খোরশেদ আলম ও শাকিল নামের দুজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আবারও চাঁদাবাজি করছেন তাঁরা।

দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাঁদের আধিপত্য বিস্তার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করতে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। অপরাধীরা পার পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় নেয়। এভাবে অপরাধী ও রাজনীতিবিদদের ‘নেক্সাস’ (অসাধু জোট) গড়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম

ভুক্তভোগী মানুষ

রাজধানীতে চাঁদাবাজির ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে চাঁদা দিতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে চাঁদার কারণে পণ্যের দাম বাড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাঁদের আধিপত্য বিস্তার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করতে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। অপরাধীরা পার পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় নেয়। এভাবে অপরাধী ও রাজনীতিবিদদের ‘নেক্সাস’ (অসাধু জোট) গড়ে ওঠে। তিনি বলেন, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ দমন করা যাবে না।