প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর থানায় এজাহারটি দিতে পারলেন আদিল হোসেন

গুলশান থানাফাইল ছবি

তিন দিন আগে রাজধানীর গুলশান এলাকায় ব্যবহৃত মুঠোফোন চুরি হয়ে যায় আদিল হোসেনের (ছদ্মনাম)। তিনি একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। প্রতিকার পেতে পুলিশের দ্বারস্থ হন। এক পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শেই রোববার দুপুরে গুলশান থানায় মামলা করতে যান তিনি। তবে একের পর এক অজুহাত দেখিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয় তাঁকে। এর মধ্যে চার দফায় পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অনুরোধ করলেও প্রায় সাত ঘণ্টার চেষ্টায় থানায় মামলার এজাহার দিতে পেরেছেন তিনি।

আদিল হোসেন গুলশান এলাকায় একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের বিজনেস এক্সিকিউটিভ পদে কর্মরত। ১৮ জুন রাত সোয়া আটটার দিকে গুলশান–১ গোলচত্বর এলাকায় তাঁর প্যান্টের পকেট কেটে মুঠোফোনটি চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্ত। এর কিছুক্ষণ পর তিনি বিকাশ কল সেন্টারে যোগাযোগ করে তাঁর ব্যবহৃত অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিতে অনুরোধ করেন। এ ঘটনার এক দিন পর হারিয়ে যাওয়া ফোনে থাকা সিমটি আবার উত্তোলন করেন তিনি। সিম ফিরে পাওয়ার পর বিকাশ কল সেন্টারে যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্টের একটি নতুন পিন নম্বর ঠিক করেন। সেই পিন নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্টে প্রবেশের পর তিনি দেখতে পান, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ১৪ ধাপে ৮৫ হাজারের বেশি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

আদিল হোসেন বলেন, আইন ও ধারা জানার পর মোখলেসুর রহমান জানান যে এই মুহূর্তে থানায় কোনো টাইপরাইটার নেই। তাঁদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। এ সময় তিনি তাঁদের দুপুরের খাবার খেয়ে আসতে বলেন। দুপুরের খাবার শেষ করে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁরা আবার থানায় আসেন। আসার পর কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান মোখলেসুর রহমান বিশ্রামে গেছেন। কখন আসবেন তা বলে যাননি। এমনকি মামলা নেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও দিয়ে যাননি। তাঁদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

ভুক্তভোগী আদিল হোসেন জানান, এই ঘটনার প্রতিকার চাইতে রোববার সকালে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার নিরাপত্তা বিভাগে যান। সেখানে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। অভিযোগ শুনে ডিবির কর্মকর্তারা তাঁকে গুলশান থানায় একটি মামলা করার পরামর্শ দেন। তাঁদের পরামর্শেই বেলা আড়াইটার দিকে দুলাভাই ও মাকে নিয়ে গুলশান থানায় যান তিনি।

আদিল হোসেন জানান, থানায় যাওয়ার পর প্রথমে থানার অভ্যর্থনা ডেস্কে থাকা এক পুলিশ সদস্যের কাছে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে দেখা করতে চান তাঁরা। ডিবি অফিস থেকে তাঁদের পাঠিয়েছে, তিনি একটি মামলা করতে চান বলে ওই পুলিশ সদস্যকে জানান। এ সময় অভ্যর্থনা ডেস্কে থাকা ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘ওসি স্যার’ এখন দেখা করতে পারবেন না। কয়েক দফা অনুরোধের পর ওই পুলিশ সদস্য জানান, ‘ওসি স্যার’ মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

আদিল হোসেন জানান, প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর আবারও দেখা করার অনুমতি চাইলে অপর এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘ওসি স্যার’ লাঞ্চ (দুপুরের খাবার) করছেন। এর মধ্যে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সরকারি মুঠোফোন নম্বরে আদিল হোসেনের এক স্বজন যোগাযোগ করলে ওই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান ফোন ধরেন। তিনি জানান, ওসি ছুটিতে আছেন। এখন তিনিই ভারপ্রাপ্ত ওসির দায়িত্বে আছেন। মামলা করতে হলে তাঁকে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

পরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে ভুক্তভোগীদের নিজ কক্ষে ডেকে পাঠান মোখলেসুর রহমান। কক্ষটিতে ঢুকতে গেলে আরও পাঁচ মিনিট তাঁদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলা হয়। বলা হয়, তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন। পরে বিকেল চারটার দিকে তাঁদের কক্ষে ঢুকতে অনুমতি দেন। কক্ষের ভেতরেও কিছু সময় তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়। এর মধ্যে দ্রুত মামলটি গ্রহণ করতে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমানকে মুঠোফোনে নির্দেশ দেন। পরে তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন তিনি। ঘটনা শোনার পর তাঁকে ডিবির ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আবার ফোন করে কোন আইন ও ধারায় মামলা নেবেন তা জানাতে বলেন। পরে আইন ও ধারা জেনে তাঁকে জানানো হয়।

আদিল হোসেন বলেন, আইন ও ধারা জানার পর মোখলেসুর রহমান জানান যে এই মুহূর্তে থানায় কোনো টাইপরাইটার নেই। তাঁদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। এ সময় তিনি তাদের দুপুরের খাবার খেয়ে আসতে বলেন। দুপুরের খাবার শেষ করে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁরা আবার থানায় আসেন। থানায় আসার পর কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, মোখলেসুর রহমান বিশ্রামে গেছেন। কখন আসবেন তা বলে যাননি। এমনকি মামলা নেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও দিয়ে যাননি। তাঁদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

‘কেন এত সময় লাগল, সেটা বাদীকেই জিজ্ঞাসা করেন। তাহলে উত্তরটা পেয়ে যাবেন। তার পরও যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে একসময় সময় পেলে থানায় আইসেন, বুঝিয়ে বলব। চায়ের দাওয়াত রইল।’
মোখলেসুর রহমান, পরিদর্শক (তদন্ত), গুলশান থানা

আরও কিছু সময় অপেক্ষার পর মামলার এজাহার লেখা শুরু করা হয়। প্রথমে থানার যে কর্মকর্তা এজাহার লেখা শুরু করেন, তাঁর লেখা ঠিক না হওয়ায় অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাত পৌনে আটটার দিকে এজাহারের খসড়া প্রস্তুত হলে তাতে কিছু বিষয় সংশোধন করতে নির্দেশ দেন মোখলেসুর রহমান। নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধন করে প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ৯টার দিকে এজাহার প্রস্তুতের কাজ শেষ হয়। তারপর তাঁদের জানানো হয়, মামলার কপি আজ (রোববার) হাতে পাবেন না। কপি পেতে হলে আগামীকাল (সোমবার) আবার আসতে হবে।

আদিল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে কখনো থানা–পুলিশ করা লাগেনি। ফোন চুরি ও টাকা খোয়া যাওয়ার পরে মানসিকভাবে এমনিতেই বিপর্যস্ত ছিলাম। আইনি প্রতিকার পেতে এসে যে ভোগান্তি হলো, আর তাতে আরও ভেঙে পড়েছি। আড়াইটায় থানায় এসে রাত ৯টা পর্যন্ত থেকেও কাজ সম্পন্ন হলো না। আইনি প্রতিকার পেতে এসেও যদি এমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে আর যাব কোথায়?’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন এত সময় লাগল, সেটা বাদীকেই জিজ্ঞাসা করেন। তাহলে উত্তরটা পেয়ে যাবেন। তার পরও যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে একসময় থানায় আইসেন, বুঝিয়ে বলব। চায়ের দাওয়াত রইল।’

গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতাম না। আপনার মাধ্যমে অবগত হলাম। ঘটনাটির যথাযথ অনুসন্ধান করব। কেন তারা সেবাপ্রত্যাশীর প্রতি সংবেদনশীল হয়নি, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখব। তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। পরে যেন তারা এ বিষয়ে সতর্ক থাকে, সেটি নিশ্চিত করব।’

ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে দায়িত্বরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বসবাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই থানা এলাকায় বসবাস করেন। এসব বিবেচনায় গুলশানে আইনশৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। সেখানে গুলশান থানায় গিয়ে একটি মামলার এজাহার দায়েরের জন্য এত সময় লাগার কথা তুলে ধরে ভুক্তভোগীরা বলেছেন, এখানে এভাবে ভুগতে হলো। তাহলে দেশের অন্যান্য থানায়ও কি সেবা পেতে মানুষকে এমন হয়রানির শিকার হতে হয়?