পিবিআই বলছে, আশিক ও ফারহানা দম্পতি বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। তারপর নানা প্রলোভনে ফেলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। তাঁরা একাধিক প্রতারণা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। এমনকি একটি মামলায় আশিকের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুষ্টিয়া জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক রবিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে আশিকের বাবা আবদুস সাত্তার ও ফারহানার বাবা ফিরোজ উর রহমান ও মা সাহিদা খাতুনেরও (পারুল) প্রতারণায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সে কারণে অভিযোগপত্রে তাঁদেরও আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আশিক–ফারহানা দম্পতির সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের মুঠোফোনে কল করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

ভুয়া ফেসবুক আইডি দিয়ে শুরু

পিবিআইয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মন্ত্রী ও তাঁর মেয়ের নাম–ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলেছিলেন আশিক–ফারহানা দম্পতি। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ওই আইডি থেকে পৌর কাউন্সিলর শাহীন উদ্দিনকে বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পাঠানো হয়। পরে ওই আইডি থেকে শাহীনের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে কথা বলেন তাঁরা। তাঁকে এই কথোপকথনের বিষয়টি কাউকে না জানানোর অনুরোধ করা হয়।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকের ওই আইডি থেকে ওই মন্ত্রীর মেয়ের পরিচয় দিয়ে শাহীনকে কল করা হয়। বলা হয়, তাঁর এক ভাই ও এক বোন কুষ্টিয়ায় বেড়াতে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে তিনি যেন দেখা করেন। ওই ভাইবোন পরিচয়ে শাহীনের অফিসে যান আশিক ও ফারহানা দম্পতি। পরেও বিভিন্ন সময়ে তাঁরা শাহীনের অফিসে যেতেন।

মন্ত্রীর সঙ্গে থেকে তাঁরা কী কাজ করেন, কীভাবে মানুষের উপকার করেন—এসব বিষয়ে আলোচনা করতেন। একসময় এই দম্পতি ফেসবুক মেসেঞ্জারে একজনকে মন্ত্রী সাজিয়ে তাঁর সঙ্গে শাহীনের কথাও বলিয়ে দেন।

২০১৭ সালের প্রথম দিকে আশিক–ফারহানা দম্পতি শাহীনের অফিসে গিয়ে তাঁকে ওই মন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুরোধ করেন। তখন মন্ত্রী পরিচয়ে একজন শাহীনকে বলেন, তাঁর মেয়ে এখন লন্ডনে আছেন। তিনি না আসা পর্যন্ত আশিক ও ফারহানা কুষ্টিয়ায় থাকবেন। এ সময় দুজনের দিকে খেয়াল রাখতে বলেন।

কিছুদিন পর এই আশিক–ফারহানা দম্পতি শাহীনের অফিসে গিয়ে মন্ত্রিকন্যার সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। তখন একজন মন্ত্রীর মেয়ে সেজে কাউন্সিলর শাহীনকে বলেন, ওই দম্পতির খরচের টাকা শেষ হয়ে গেছে। তাঁদের এক লাখ টাকা ধার দিতে হবে। লন্ডন থেকে ফিরে তিনি টাকা ফেরত দেবেন। এরপর আশিক–ফারহানাকে এক লাখ টাকা দেন শাহীন। এ ঘটনার দুই দিন পর তাঁর কাছ থেকে কৌশলে আরও এক লাখ টাকা নেন দুজন।

এভাবে দুই দফায় টাকা নেওয়ার পর নতুন গল্প ফাঁদেন এই দম্পতি। শাহীনের অফিসে এসে বলেন, মন্ত্রিকন্যা লন্ডনে বিপদে পড়েছেন। তাঁর ৬ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু পারিবারিক বিরোধের কারণে তাঁর বাবা তাঁকে টাকা দিচ্ছেন না। পরে ধার হিসেবে শাহীন তাঁদের হাতে ৬ লাখ টাকা তুলে দেন। কিছুদিন পর একই কৌশলে শাহীনের কাছ থেকে আরও দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

কাউন্সিলর শাহীন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন, এটা বুঝতেই পারেননি। সরল মনে ওই দম্পতির কথা বিশ্বাস করেছিলেন। অর্থ লেনদেনের সব প্রমাণ তাঁর কাছে আছে। এসব প্রমাণ তিনি সিআইডিকেও দিয়েছিলেন। তবে সিআইডি প্রতারক চক্রের পক্ষে প্রতিবেদন দিয়েছে। পরে পিবিআইয়ের তদন্তে সত্যটা বেরিয়ে এসেছে।

চাকরি ও ঠিকাদারির প্রলোভন

পিবিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহীন উদ্দিনের কাছ থেকে ধার হিসেবে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর আশিক ও ফারহানা দম্পতি পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবরক্ষক পদে নিয়োগে তাঁরা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন বলে শাহীনকে বলেন। পরে শাহীন উদ্দিন তাঁর মামাতো ভাই নিজাম উদ্দিনের চাকরির বিষয়ে ওই দম্পতির সঙ্গে আলোচনা করেন। নিজাম উদ্দিনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে দুজন হাতিয়ে নেন চার লাখ টাকা।

এরপর ওই দম্পতি শাহীন উদ্দিনকে ঠিকাদারির প্রলোভন দেখান। তাঁর সঙ্গে তালবাড়িয়া বালুঘাটে আড়াই কিলোমিটার নদীশাসনের ব্লকের ঠিকাদারির কাজের বিষয়ে আলোচনা করেন।

শাহীন জানান, তিনি ঠিকাদারি করেন না। তবে তাঁর মামাতো ভাই ঠিকাদারির কাজ করেন। মামাতো ভাইকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রথম দফায় তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আশিক ও ফারহানা। কিছুদিন পর এই দম্পতি শাহীনকে জানান, কাজ পাইয়ে দিতে মন্ত্রী ডিও লেটার দিয়েছেন জেলা প্রশাসককে। এ–সংক্রান্ত একটি ভুয়া চিঠির ফটোকপিও শাহীনকে দেন এই দম্পতি। এই কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁরা আরও ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

যেভাবে বুঝলেন ফাঁদে পড়েছেন

নানা কৌশলে শাহীন ও তাঁর দুই আত্মীয়ের কাছ থেকে ৩৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কিছুদিন পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাকরির ফল প্রকাশিত হয়। দেখা যায় নিজাম উদ্দিনের চাকরি হয়নি। এ নিয়ে আশিক ও ফারহানাকে চাপ দেওয়া হলে তাঁরা চার লাখ টাকা ফিরিয়ে দেন। তখন তাঁরা বলেন, কোনো ঝামেলার কারণে হয়তো চাকরি হয়নি।
ঠিকাদারি কাজের বিষয়ে কাউন্সিলর শাহীন চাপ দিলে প্রথমে কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আশিক–ফারহানা। একপর্যায়ে নারী নির্যাতনের মামলার হুমকিও দেন তাঁরা। কিছুদিন পর মুঠোফোন বন্ধ করে দেন। এরপর শাহীন বুঝতে পারেন তিনি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন