ফুটপাত থেকে ৬৫০ টাকায় চাকুটি কিনেছিল ১৬ বছরের কিশোরটি। শখের জিনিসটি পেয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিল যে বন্ধুদের ডেকে ডেকে দেখিয়েছিল। কয়েক দিন পর তার জন্মদিনের রাতে সেই চাকুই কেড়ে নিল এক রিকশাচালকের প্রাণ।
এর আগে ওই কিশোরের কোনো অপরাধে জড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। সঙ্গে থাকা তার দুই বন্ধুরও এমন কোনো অতীত পায়নি পুলিশ। তারপরও একটি রাতের কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহে তিন কিশোরের জীবন জড়িয়ে গেল একটি হত্যা মামলায়।
শুরুটা জন্মদিনের পার্টি দিয়ে। এরপর প্রথমবার মদ পান, গভীর রাতে বন্ধুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি, এক রিকশাচালকের সঙ্গে সামান্য বাগ্বিতণ্ডা, আরেক বন্ধুর উসকানি, একটি থাপ্পড় এবং সবশেষে শখ করে কেনা চাকুর একটি আঘাত। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে এমন ঘটনাপ্রবাহই উঠে এসেছে।
গত বুধবার ভোররাতে রাজধানীর দারুসসালামের গাবতলী এলাকায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত তিন কিশোরকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করেছে ডিবির মিরপুর বিভাগ। একজনের বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। অন্য দুজনের বয়স ১৫ বছরের কম।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন কিশোরদের অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে কিশোরদের সম্পৃক্ততায় দুটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানও চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকাতেই ১২৭টি ‘কিশোর গ্যাং’ বা উপদল শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরও সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে।
যদিও গাবতলীর ঘটনাটিতে এখন পর্যন্ত সংগঠিত কোনো গ্যাংয়ের যোগসূত্র পায়নি পুলিশ। ফলে এখানে শুধু কিশোর গ্যাং নয়; সাধারণ কিশোরদের জীবনেও অস্ত্র, নেশা, গভীর রাতের আড্ডা ও বন্ধুদের উসকানির মতো ঝুঁকির বিষয়গুলো কতটা সহজে ঢুকে পড়ছে, সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে।
শখের চাকু কেনার কয়েক দিন পর
ডিবি সূত্র জানায়, সাদ (ছদ্মনাম) নামের ওই কিশোর কিছুদিন আগে ফুটপাত থেকে শখের বশে ৬৫০ টাকা দিয়ে একটি চাকু কিনেছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, চাকুটি কেনার পর বেশ উচ্ছ্বসিত ছিল সাদ। কয়েক বন্ধুকে ডেকে সেটি দেখিয়েছিল। বাইরে বের হলে চাকুটি নিজের সঙ্গে রাখত।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাদের ১৬ বছর পূর্ণ হয়। জন্মদিন উপলক্ষে বয়সে বড় পরিচিত একজন তাকে একটি পার্টিতে ডাকেন। তদন্তকারীদের কাছে সাদ দাবি করেছে, ওই পার্টিতেই জীবনে প্রথমবার মদ পান করে সে।
পার্টি শেষে রাত একটার দিকে গাবতলী এলাকায় আসে সাদ। তখন বন্ধু ফরিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে বাসা থেকে ডেকে আনে। জন্মদিন উপলক্ষে রাতে ঘোরাঘুরি করার কথা বলে তাকে সঙ্গে নেয়।
দুজন গাবতলী এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিল। এমন সময় পায়ে চালিত একটি রিকশা তাদের পাশ দিয়ে যায়। রিকশাচালকের আচরণ দেখে শুরুতে তাঁকে ছিনতাইকারী বলে সন্দেহ করে দুই কিশোর। পরে সে রকম কিছু নয় বুঝতে পারলেও চালকের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে রিকশাচালক সেখান থেকে চলে যান। ঘটনাটিও তখন সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত; কিন্তু তা হয়নি।
আরেক বন্ধু এল, আবার সামনে সেই চালক
রাত তিনটার দিকে সাদ ও ফরিদ তাদের আরেক বন্ধু জাহিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে বাইরে ডাকে। প্রথমে বের হতে চায়নি জাহিদ। পরে সাদের জন্মদিনের কথা শুনে বাসা থেকে বের হয়।
তিন বন্ধু গিয়ে বসে গাবতলীর আল্লাহর দান হোটেলের পাশের একটি চায়ের দোকানে। সেখানে আড্ডার একপর্যায়ে আগের রিকশাচালকের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার কথা ওঠে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ঘটনা শুনে জাহিদ ওই রিকশাচালককে আবার পেলে মারধর করার জন্য বন্ধুদের উসকানি দেয়। ঠিক এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিন কিশোর আবার সেই রিকশাচালককে দেখতে পায়।
ডিবি সূত্র জানায়, রিকশাচালককে দেখেই সাদ ও জাহিদ আবার কথা-কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রিকশাচালক রিকশা থেকে নেমে পাশের আল্লাহর দান হোটেলের ভেতরে ঢুকে যান। এতে কিশোরদের ধারণা হয়, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেই হোটেলের ভেতরে গেছেন ওই চালক। তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়।
কিছুক্ষণ পর রিকশাচালক হোটেল থেকে বেরিয়ে এলে জাহিদ তাঁকে থাপ্পড় মারে। এর পরপরই সাদ সঙ্গে থাকা সেই ৬৫০ টাকার চাকুটি বের করে রিকশাচালকের ঘাড়ের পেছনে আঘাত করে।
তদন্তকারীরা বলছেন, পুরো ঘটনা ঘটে অল্প সময়ের মধ্যে।
রিকশা চালিয়েই বাঁচার চেষ্টা
চাকুর আঘাত পাওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশায় উঠে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন ওই রিকশাচালক। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর রিকশার ওপরে পড়ে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তিন কিশোরও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান প্রথম আলোকে বলেন, তিন কিশোরের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধে জড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা পেশাদার অপরাধীও নয়। তিনি বলেন, ‘উঠতি বয়সের উত্তেজনা, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও বন্ধুদের উসকানি থেকে তারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।’
সিসিটিভিতে তিন কিশোর
গাবতলীতে রিকশাচালক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দারুসসালাম থানায় করা হত্যা মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি। হত্যাকাণ্ডের পরদিন থেকেই জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেন তদন্তকারীরা। আল্লাহর দান হোটেল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন কিশোরের ছবি শনাক্ত করা হয়।
প্রথম দিকে গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, পেশাদার ছিনতাইকারীরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। সেই সন্দেহে তিন ছিনতাইকারীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তবে তাদের কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
পরে সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ছবি তাদের দেখানো হয়। তাদের একজন ফরিদকে চিনতে পারে। কারণ, ফরিদ গাবতলী এলাকার একটি হোটেলে কাজ করত। এরপর প্রথমে ফরিদকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাহিদকে ভোলা এবং সাদকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে হেফাজতে নেয় ডিবি।
জানা গেল রিকশাচালকের পরিচয়
ঘটনার তিন দিন পর গতকাল নিহত রিকশাচালকের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। তাঁর নাম ইমন সর্দার (২৬)। পাবনা সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামের রাশেদুল ইসলাম ওরফে মুন্না সর্দারের ছেলে। তাঁর বাবা পেশায় গাড়িচালক।
পরিবারের বরাতে ডিবি সূত্র জানায়, ইমন ঢাকায় এসে কখনো রিকশা চালাতেন, কখনো দিন মজুরের কাজ করতেন। পরিবারের সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ ছিল না।
বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় পরিবারে অশান্তি ছিল। এ জন্য তিনি বাড়ি যেতে চাইতেন না।
ডিবি সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর রিকশাচালকের নাম, পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিল না পুলিশ। পরে ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় জানা যায়। এরপর গতকাল রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে তাঁর মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনাটি উদ্বেগজনক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, কিশোর বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা অপরাধ বা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেন ফাতেমা রেজিনা ইকবাল। তিনি বলেন, ‘সন্তান কখন বাইরে গেল, কোথায় গেল এবং কাদের সঙ্গে মিশল, সেই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। গাবতলীর ঘটনাটি সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।’