এসআরবির তদন্ত
ভোরে প্রশ্নপত্র আসে এনবিআরের দুই কর্মীর কাছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উত্তরসহ
ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের কাছে। পৌনে দুই ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র। সেই উত্তরপত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয় চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে। তাঁদের মাধ্যমে তা পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনের কথোপকথন ও তথ্য পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গত তিন দিন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মচারী ছাড়াও বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীও রয়েছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার ৪টি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন এ তথ্য জানান।
গত শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। অভিযোগ তদন্তে শনিবারই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে আজ আবার এই নিয়োগ পরীক্ষা নতুন করে নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর ছায়া তদন্ত
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন বলেন, ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্য পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। ওই দিন বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। ওই ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। এসআরবির গোয়েন্দা দল প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য উৎস, সরবরাহকারী, মধ্যবর্তী বিতরণকারী ও গ্রাহকদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান শুরু করে। পরে এসআরবি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পায়। এর ভিত্তিতে ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মতিঝিল থেকে শুরু, পরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাঁকে আরও দুজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার মফিজুল চাকরিপ্রার্থী। একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের দেওয়া তথ্য এবং মুঠোফোনে কথোপকথন পর্যালোচনা করে চক্রের আরও সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে উত্তরখান এলাকা থেকে এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫) এবং মিরপুর ১০ এলাকা থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে (৩৩) গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর মুঠোফোনের চ্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সাভার এলাকা থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আজ মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্নপত্র থেকে উত্তরপত্র, এরপর বিতরণ
সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনে বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তার সহকর্মী ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। পরবর্তী ধাপে চক্রের সদস্যদের নিজস্ব প্রার্থী এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এতে আসাদুল ইসলাম, রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করত। চক্রের সদস্যরা তাঁদের জানাশোনা প্রার্থীর কাছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তরপত্র বিক্রি করেছেন। কতজনের কাছে তাঁরা প্রশ্ন বিক্রি করেছেন জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়ে কিছু জানাননি। জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষায় ৮-১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ১৫-২০ লাখ টাকায় ফাঁস করতেন।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ ও একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর কার থেকে পেলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা সদুত্তর দেননি। যুব উন্নয়নের কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত আছে কি না জানতে চাইলে এসআরবি কর্মকর্তা ফায়েজুল আরেফিন বলেন, তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।