মিথ্যা মামলায় ব্যবস্থা কম

অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ৪২% মামলার ক্ষেত্রে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনই করেন না তদন্ত কর্মকর্তা।

  • ১৫ থানার ২০১০-২০১৮ সালের মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ।

  • তদন্ত শেষ হওয়া মোট মামলা ৪০,৮৭৩।

  • অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত ৬২২ (১.৫২%)।

প্রতীকী ছবি

দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ মিথ্যা অভিযোগে করা হয়েছে। এ ধরনের ৪২ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রেই বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করে না পুলিশ। তারা প্রতিপক্ষকে হয়রানির মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ‘অধর্তব্য বা ভুল–বোঝাবুঝি’ উল্লেখ করেন। পুলিশের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তবে এই গবেষণায় শুধু দণ্ডবিধির বিভিন্ন অপরাধের মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিস্ফোরক আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনসহ আরও কয়েকটি আইনে করা মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকারকর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব আইনেই মিথ্যা অভিযোগে বেশি মামলা হয়। এ কারণে পুলিশের গবেষণার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

গবেষণার জন্য সাত মহানগর ও পুলিশের আট রেঞ্জের একটি করে ১৫টি থানা বেছে নেওয়া হয়। এসব থানায় ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দায়ের হওয়া মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের সাময়িকী ডিটেকটিভ–এ গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘মিথ্যা মামলার আইনি প্রতিকার’ শীর্ষক এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।

বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক আইনের মামলা গবেষণায় নেই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ ও ১৮ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং বিস্ফোরক আইনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলার আসামিদের মধ্যে মৃত ব্যক্তি, হজে যাওয়া ব্যক্তি, কারাবন্দী ব্যক্তিও ছিলেন। কেবল ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীতে ৫৭৮টি মামলা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে বিএনপি এমন দুই দফায় ২ হাজার ৪৮টি মামলার প্রায় দেড় লাখ আসামির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেয়। তারা এগুলোকে ‘গায়েবি’ মামলা বলে উল্লেখ করেছিল। বেশির ভাগ মামলার বাদী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

মানবাধিকার সংগঠক নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাসহ কয়েকটি আইনের মামলা বাইরে রেখে যে গবেষণা করা হয়েছে, তাতে কোনোভাবেই প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে না। মিথ্যা অভিযোগে মামলার হার অনেক বেশি। পুলিশের ব্যর্থতা ঢাকতে এমন গবেষণা হতে পারে।’

এই গবেষণার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে নূর খান বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বিরোধী মতকে দমন-নিপীড়নে যেসব আইনে মামলা হয়, সেগুলোর অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। তাই এগুলোকে বাইরে রেখে করা গবেষণার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

গবেষক দলের প্রধান পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কমান্ড্যান্ট অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুর রাজ্জাক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের গবেষণা এবারই প্রথম। এ কারণে সংক্ষিপ্ত আকারে করা হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৫টি থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮৬টি মামলা হয়েছে রাজধানীর রমনা থানায় এবং সবচেয়ে কম ১১টি লালমনিরহাটের আদিতমারী থানায়। গ্রামের তুলনায় শহরে মিথ্যা অভিযোগের মামলার হার বেশি।

রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৮ সালে দায়ের হওয়া এসব মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছি কি না, সেটি তিনি জানেন না। গবেষণায় যে সময়কালের তথ্য–উপাত্তের কথা বলা হচ্ছে, সেই সময়ে তিনি রমনা থানার দায়িত্বে ছিলেন না।

পুলিশের গবেষণার উদ্দেশ্য

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে আগে মিথ্যা অভিযোগের মামলাসংক্রান্ত কোনো গবেষণা বা সমীক্ষা হয়নি। মিথ্যা মামলার প্রকৃতি, বিস্তার ও ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকারের বর্তমান ব্যবস্থার কার্যকারিতার মূল্যায়ন করা এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য। গবেষণায় বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণির মানুষ মিথ্যা মামলার ‘ভাড়াটে’ বাদী হিসেবে কাজ করছেন।

গবেষণায় বলা হয়, কারও কারও বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় নারী নির্যাতন, মানব পাচার, অ্যাসিড নিক্ষেপ, প্রতারণাসহ নানা অভিযোগে ৬০টি পর্যন্ত মামলা হয়েছে। মূলত রাজারবাগ শরিফের পীরের তত্ত্বাবধানে মামলা দায়েরের ‘সংঘবদ্ধ চক্র’ গড়ে উঠেছে।

জায়গা-জমি দখল করতে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছিল এই চক্র। চক্রের সদস্যরা একরামুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা করে। এই সংঘবদ্ধ চক্রের মিথ্যা অভিযোগে করা মামলায় এখনো কারাগারে আছেন আশুলিয়ার সোহরাব হোসেন এবং তাঁর ছেলে ফজলে হামিম সায়মন।

গবেষণায় বলা হয়, মিথ্যা অভিযোগের ৬২২টি মিথ্যা মামলার মধ্যে ১৮৮টি বা ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ হয়েছে চুরির অভিযোগে। মারামারি, হুমকির অভিযোগে ১০ শতাংশের বেশি মামলা হয়েছে। এর বাইরে চাঁদাবাজি, অনধিকার প্রবেশ, আটক, খুনের চেষ্টা, জালিয়াতি, ক্ষতির চেষ্টা, প্রতারণা, নারীর শ্লীলতাহানি, অপহরণ ও আত্মসাতের অভিযোগেও মামলা হয়েছে।

বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না

গবেষণায় উঠে এসেছে, মিথ্যা মামলার বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রসিকিউশনের সঠিক উদ্যোগ নেই। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও প্রায় ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় প্রসিকিউশন দাখিল করেন না।

তাই মিথ্যা অভিযোগের মামলার বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে নিয়মে পরিণত হয়েছে। অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বাদী-বিবাদীর আপসরফার কারণে তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চান না। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনের ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতেও কখনো কখনো প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

গবেষক দলের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, পরবর্তী আইনি জটিলতা এড়াতে অনেক সময় বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন না অনেক তদন্ত কর্মকর্তা। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ‘অধর্তব্য অপরাধ’ বা ‘ভুল–বোঝাবুঝি’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, মিথ্যা অভিযোগের মামলার কারণে আদালতের সময় নষ্ট, বিবাদী আর্থিক ক্ষতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিচারিক কার্যক্রম নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। আইনের শাসনের প্রতি মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে।

ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, মামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অবশ্যই বাদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন দাখিল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ও বিবাদী দুজনই বিষয়টি আদালতের নজরে আনবেন। কারণ, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।