অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় ৬০টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৩৬টিতে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

আজ বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা সাধারণ মানুষের প্রায় ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। ভুক্তভোগীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

র‌্যাবের ভাষ্য, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়ার বাসিন্দা খন্দকার আবুল কালাম আজাদ। তিনি ২০০৩ সালে দৌলতপুরে জনতা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি চালু করেন। সেখানে সহজ শর্তে ব্যবসায়ীদের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা ও প্রান্তিক মানুষের জন্য ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রাহকেরা ‘তফসিলি ব্যাংক’ মনে করে তাতে আমানত রাখতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া, খুলনা, মেহেরপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ‌‌‘জনতা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে যাত্রা শুরু করে। অনেক ব্যবসায়ীকে প্রতিষ্ঠান মোটা অঙ্কের ঋণ দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঝুঁকে পড়েন। মূলত আজাদ তাঁর স্ত্রী, ছোট ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন। এভাবে অল্প সময়ে প্রচুর অর্থ জামানত হিসেবে গ্রহণ করে আত্মসাৎ করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭ সালে বিভিন্ন জেলা থেকে অফিস গুটিয়ে নেন আজাদ। এরপর তিনিসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা সবাই গা ঢাকা দেন।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, ২০১৭ সালে সমিতির গ্রাহকসংখ্যা ছিল সাত-আট হাজার। গ্রাহকেরা ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত রাখে। শুরুর দিকে  মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য জামানত প্রদানকারী গ্রাহকদের মুনাফাও দেওয়া হতো। ২০১৭ সালে তাঁর কাছে রক্ষিত গ্রাহকদের সঞ্চয়-আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। সে বছরই তিনি ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আঞ্চলিক সব অফিস গুটিয়ে নেন। যোগাযোগের সব ফোন নম্বর বন্ধ করে ঢাকার উত্তরায় এসে গা ঢাকা দেন। পালানোর সময় মাঠপর্যায়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ ৩২ লাখ ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় আজাদ। যা তিনি আর সংগ্রহ করতে পারেননি।

কমান্ডার মঈন বলেন, মাঠপর্যায়ে গ্রাহক ও অর্থ সংগ্রহের জন্য গ্রেপ্তার আজাদের সঙ্গে আট শতাধিক কর্মী ছিলেন। তাঁদের কোনো বেতন দেওয়া হতো না। তাঁদের গ্রাহকদের বিনিয়োগ থেকে আসা বার্ষিক মুনাফার ১৮ থেকে ২০ শতাংশ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।

র‌্যাব জানায়, প্রতিষ্ঠানটি দিনমজুর, চায়ের দোকানদার, মুদিদোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবীকে টার্গেট করত। গ্রাহক বাড়ানোর জন্য আজাদ বিভিন্ন সময়ে বিশেষ প্যাকেজ ও প্রণোদনা ঘোষণার মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতেন। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান না হলেও তারা ব্যাংকের মতোই গ্রাহকদের থেকে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ দিতেন।

এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকার মধ্যে। তবে গ্রাহকদের তথ্যমতে, সংগৃহীত টাকার পরিমাণ আরও বেশি।

৬০ মামলার ৩৬টিতে  গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে আজাদের নামে কুষ্টিয়া, খুলনা, মেহেরপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার বিভিন্ন থানায় ৬০টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে ৩৬টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

গ্রেপ্তার আজাদ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ (স্নাতক) পাস করেন। পড়াশোনার সময় আজাদ ইটের ভাটার ব্যবসা, ঠিকাদারি ব্যবসা ও সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।  

ডেভেলপার কোম্পানি ছিল তাঁর

তিনি ঠিকানা লিভিং লিমিটেড নামে আরও একটি ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে ফ্ল্যাট তৈরি করে কেনাবেচা করতেন। প্রতিষ্ঠানের নাম করে কুষ্টিয়ায় ১৫ বিঘা জমি, একটি ছয়তলা ভবন, একটি ইটের ভাটা ও রাজশাহীতে ১১ বিঘা জমি কিনেছেন।

উত্তরায় কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর

আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে আজাদ রাজধানীর উত্তরায় বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনেন। তাঁর স্ত্রীর নামে পোস্ট অফিসে ২০ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর হিসাব রয়েছে এবং একটি প্রাইভেট ব্যাংকে তার ২ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রচুর সম্পদ রয়েছে।